খালেদা জিয়ার জামিন আশায় অক্টোবরে কাউন্সিলের চিন্তা বিএনপিতে

আগামী অক্টোবরকে টার্গেট করে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিয়ে এগুচ্ছে বিএনপি। এবার কাউন্সিলের মাধ্যমে তারুণ্য নির্ভর নেতৃত্ব নিয়ে আসার চিন্তাভাবনা চলছে। দলের স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে সর্বস্তরের কমিটিতে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতারা গুরুত্ব পাবেন বলে জানা গেছে। প্রবীণ নেতাদের ঠাঁই হবে উপদেষ্টা কমিটিতে।
হঠাৎ বিএনপি নেতাদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে- দ্রুতই কারাবন্দী চেয়ারপারসন বেগম জিয়া জামিনে মুক্তি পাবেন। তার মুক্তি লাভের পরপরই কাউন্সিল করার চিন্তাভাবনা চলছে দলটিতে। কারাবন্দী বেগম জিয়ার ‘সবুজ সংকেত’ নিয়েই কাউন্সিলের প্রাক প্রস্তুতির দিকে এগুচ্ছে দলটি।
গতকাল রোববার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানও বলেন, ‘আমরা আশা করছি, সরকার বাধা না হলে দ্রুতই কারাবন্দী বাকি দুই মামলায় (জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল মামলা) জামিন পাবেন।’
একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘কাউন্সিলের জন্য যাবতীয় সব প্রস্তুতি আমরা নিয়ে রাখব। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি হলেই যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে কাউন্সিল করা যায়। ’
সর্বশেষ গত শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও কাউন্সিল নিয়ে কথা বলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি কাউন্সিলের পূর্ব প্রস্তুতি নিতে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করেন। আগামী শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কাউন্সিলের জন্য উপ-কমিটি গঠন নিয়ে আলোচনা হবে। দলের গঠনতন্ত্রে কো-চেয়াম্যান ও অতিরিক্ত মহাসচিবসহ নতুন পদ সৃষ্টি ও সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব পদ বিলুপ্ত করাসহ কিছু সংশোধন আনা হবে।
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, এবারের কাউন্সিল বিগত সময়ের মতো জাকজমকপূর্ণ না নাও হতে পারে। অনেকটা ঘরোয়া পরিবেশেই কাউন্সিল অনুষ্ঠান করার চিন্তাভাবনা চলছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত শনিবার সকালে এক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বলেন, ‘দলের জাতীয় কাউন্সিলের আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। কাউন্সিলের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে আমাদের সাংগঠনিক জেলা ও অঙ্গসংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে গতকাল রোববার বিকেলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আমরা সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের কথা ভাবছি। সর্বাগ্রে আমাদের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রত্যাশা করছি। সরকার হস্তক্ষেপ না করলে আশা করছি, শিগগিরই বেগম জিয়া মুক্তি পাবেন। তাকে নিয়েই আমরা কাউন্সিল করতে চাই। নতুন নেতৃত্বে বিএনপিকে চাঙা করাই আমাদের উদ্দেশ্য।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ট নেতা ব্যারিস্টার নওশাদ জমির বলেন, ‘বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনতে দলের মধ্যে কাউন্সিলের চিন্তা আছে।’
এদিকে সপ্তম কাউন্সিলের দিনক্ষণ ঠিক না হলেও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম এরই মধ্যে মহাসচিব হিসাবে নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
এ দিকে কাউন্সিলের আগে বিএনপি সারা দেশের বিভাগীয় পর্যায়ে বেগম জিয়ার মুক্তি দাবিতে সভা সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল শনিবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কেন্দ্রীয় নেতারা বিভাগীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক সফরও করতে পারেন। বেগম জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকেও সম্পৃক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে। এ নিয়ে আজ সোমবার ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, বিগত আন্দোলন সংগ্রামে ত্যাগী নেতাদের আগামী দিনের নেতৃত্বে মূল্যায়ন করা হবে। দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য, ত্যাগী ও অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। সংস্কারপস্থিদের মধ্যে যারা দলে সম্পৃক্ত হয়েছেন তাদেরও পদায়ন করা হবে। তবে এবার সব কমিটিই হবে তারুণ্যনির্ভর। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে পিছিয়ে থাকা নেতাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা হবে না। এ সরকারের আমলে যাদের গায়ে মামলা হয়নি, হামলার শিকার হননি, সরকারের সঙ্গে আতাত করে নিজের ব্যবসা বাণিজ্য টিকিয়ে রেখেছেন তাদের প্রতিও কড়া দৃষ্টি রাখছে বিএনপির হাইকমান্ড। এ ছাড়া কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত কমিটিতে এবাওর ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি বাস্তবায়নের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হবে।
জানা যায়, গত কাউন্সিলের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এবার কাউন্সিলে নেওয়া সব সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করা হবে। কাউন্সিলের তিন বছরেও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক উপ-কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এবার দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সব কমিটিই গঠন করা হবে। নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাও করা হবে। প্রয়োজনে বর্ধিত সভা করা হবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কাউন্সিলের সামগ্রিক বিষয় কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানা গেছে।
বিএনপির সিনিয়র এক নেতা জানান, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। এবার কেন্দ্র থেকে আর কোনো কমিটি চাপিয়ে দেওয়া হবে না। বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলোতে একই আদলে কমিটি গঠন করা হবে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘আমাদের দলের চেয়ারপারসন কারাগারে। সাংগঠনিকভাবে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির সঙ্গে কথা বলে তিনি দল পরিচালনা করছেন। কাউন্সিলের উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দলে। সব কমিটিতেই যোগ্য ও ত্যাগীরা যেন মূল্যায়িত হয় সেটাই চাওয়া।’
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ‘একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর দলকে চাঙা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিএনপির সর্বস্তরের কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ কাউন্সিলে বিএনপির তিন বছর মেয়াদি কমিটি হয়।’

Leave a Reply

%d bloggers like this: