জঙ্গি হামলার শঙ্কা কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদেরও সতর্ক থাকার নির্দেশ ডিএমপি কমিশনারের


ঈদে জঙ্গি হামলার শঙ্কা ছিল। সে শঙ্কা এখনও কাটেনি। এজন্য সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের নিজেদের নিরাপত্তায়ও বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। মঙ্গলবার (১১ জুন) ডিএমপি সদর দফতরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় এ নির্দেশনা দেন তিনি। সকাল ১১টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত চলা এই অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ডিএমপির ৫০ থানার ওসি থেকে উচ্চ পর্যায়ের সব কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, “কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের চলাচল ও দায়িত্ব পালনের সময় অধিক সতর্ক থাকতে হবে। পুলিশ সদস্যদের কোনও গাড়ি ‘আন অ্যাটেন্ডেন্ট’ রাখা যাবে না। গাড়ির চালক বা কোনও একজন সদস্যকে সবসময় গাড়ির সঙ্গে রাখতে হবে। গাড়ি চালু করার সময় ভালো করে চেক করে নিতে হবে। চেকপোস্টে সবসময় ‘অনগার্ড’ থাকতে হবে।” সভায় উপস্থিত থাকা একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
একমাসের ব্যবধানে রাজধানীর গুলিস্থান ও মালিবাগে পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে দু’টি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। গত ২৯ এপ্রিল গুলিস্থানে একটি ট্রাফিক বক্সের পাশে একটি ইম্প্রোভাইজ এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস- আইইডি বিস্ফোরিত হয়, যাতে ট্রাফিক পুলিশের দুই সদস্য ও একজন কমিউনিটি পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ছাড়া, ২৬ মে মালিবাগে পুলিশের বিশেষ শাখা- এসবি ও সিআইডি কার্যালয়ের পাশে পুলিশের একটি গাড়িতে টাইম বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এখানেও এক পুলিশ সদস্যসহ তিনজন আহত হন। এই দুই ঘটনার পর থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাপক নিরাপত্তা গ্রহণ করা হয়।
জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টার্গেট করে হামলা করছে। ঈদ উপলক্ষেও তাদের হামলার টার্গেট ছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ সতর্ক থাকায় তারা হামলা করতে পারেনি। তবে তারা যেকোনও সময় হামলা করতে পারে।
অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও জঙ্গিবিরোধী বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট- সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম জঙ্গি হামলার শঙ্কার বিষয়গুলো উল্লেখ করে বলেছেন, একমাসের ব্যবধানে পুলিশকে লক্ষ্য করে দুইবার হামলার চেষ্টা হয়েছে। এর অর্থ জঙ্গিরা এখনও নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ঈদের সময় তাদের হামলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সবাই সর্তক থাকায় জঙ্গিদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। এজন্য তিনি পুলিশ সদস্যদের ধন্যবাদও জানান।
অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, তারা ধারণা করছেন, রাজধানীতে জঙ্গিরা আস্তানা গেড়ে থাকতে পারে। এজন্য নতুন করে আবার ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম সংগ্রহ করার বিষয়টিতে জোর দিচ্ছেন। বর্তমানে ২১ লাখ ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা সিআইএমএস-এর ভাণ্ডারে রাজধানীতে বসবাসরত সব ভাড়াটিয়ার তথ্য সংরক্ষণের জন্য তারা একটি বিশেষ সপ্তাহ পালনের উদ্যোগও নিয়েছেন।

পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, ভাড়াটিয়া তথ্য সংগ্রহ সপ্তাহ পালনের সময় ডিএমপির আটটি ক্রাইম জোনে প্রতিদিন একযোগে তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম চালানো হবে। একইসঙ্গে ডিএমপি সদর দফতরের একটি বিশেষ টিম বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বিষয়টি তদারক ও কার্যক্রম যথাযথভাবে চলছে কিনা সে বিষয়ে অনুসন্ধান করবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, রাজধানীর সব ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ করতে পারলে জঙ্গি হামলার শঙ্কাসহ অন্য অনেক অপরাধও অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করার নির্দেশনা
অপরাধ দমন কার্যক্রমে অকারণে সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করার নির্দেশনাও আসে ডিএমপির এই অপরাধ সভা থেকে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশকে ফোর্স থেকে বের করে এনে সার্ভিস সংস্থায় রূপান্তরিত করা হচ্ছে। থানায় গিয়ে বা পুলিশের সেবা নিতে গিয়ে কোনও মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্য সবাইকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে। ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘মানুষকে সেবা দিতে হবে। কারও সঙ্গে মাস্তানি করা যাবে না। কাউকে হয়রানি কিংবা অসম্মান করা যাবে না।’
কমিশনারের বক্তব্যের রেশ ধরেই ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় বলেছেন, ‘পুলিশের সেবার মান বাড়াতে হবে। জিডি বা মামলা নেওয়ার বিনিময়ে কোনও টাকা-পয়সা নেওয়া যাবে না।’ এ ছাড়া, একই ঘটনায় যাতে ভিন্ন ভিন্ন থানায় একাধিক মামলা না হয়, সে বিষয়েও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: