ডিআইজি মিজান লাপাত্তা, স্ত্রীও দেশ ছেড়েছেন!

বহুল আলোচিত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) মিজানুর রহমান ও দুদক কর্মকর্তার মধ্যকার ৪০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় এরই মধ্যে ঘুষ দেয়ার অপরাধে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের জানান, ‘ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্তের জন্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। মঙ্গলবার (২৫ জুন) রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর আমরা তাকে (ডিআইজি মিজান) বরখাস্ত করেছি।’
এদিকে ঢাকা মহানগরের এক সময়ের প্রতাপশালী পুলিশ কর্মকর্তার পেছনে এখন হন্যে হয়ে ছুটছে দুদক। গ্রেফতার এড়াতে ডিআইজি মিজানও হঠাৎ করে লাপাত্তা হয়ে গেছেন। বেইলি রোডের বাসা, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের বাসায়ও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে তার স্ত্রী সোহেলিয়া আনার রত্না গত সোমবার দেশ ছেড়েছেন বলেও দুদকের কাছে তথ্য এসেছে।
দুদক সূত্র জানায়, ডিআইজি মিজানের স্ত্রী সোহেলিয়া আনার রত্না ২৪ জুন (সোমবার) রাতে দেশত্যাগ করেছেন। তিনি কীভাবে দেশ ছাড়লেন, তা জানতে চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বরাবর চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। সোমবার মামলা রুজুর পর থেকেই স্ত্রীসহ ডিআইজি মিজান উধাও। স্বামী-স্ত্রীর মোবাইল নম্বরও বন্ধ বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে সদ্য বরখাস্ত হওয়া দুদক পরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা এনামুল বাছিরকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে পৃথক একটি দল অনুসন্ধান চালাচ্ছে সংস্থাটি। মিজান ও বাছিরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আগামী ১ জুলাই দুদক কার্যালয়ে হাজির হতে নোটিশ জারি করা হয়েছে।
মিজানকে গ্রেফতার করার জন্য আদালতের কোনো ওয়ারেন্ট দরকার নেই বলে জানিয়েছেন দুদকের প্রধান আইনজীবী খুরশিদ আলম খান। তিনি বলেন, ‘দুদক আইনে ক্ষমতার অপব্যহার, ঘুষ লেনদেন, অবৈধ সম্পদ ও মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় যেকোনো আসামিকে পাওয়া মাত্র গ্রেফতারের সুযোগ রয়েছে।’
সূত্র জানায়, ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত নারী কেলেঙ্কারি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত টিমের রিপোর্ট দুদকের কাছে পৌঁছেছে। এদিকে, ডিআইজি মিজানুর রহমান ও দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ফরেনসিক রিপোর্টে প্রমাণিত হওয়ায় তারা এখন অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছেন।
তাদের দুই জনের বিদেশ গমনের ওপরই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দুদক থেকে মঙ্গলবার পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শকের বরাবর যে চিঠি পাঠানো হয় তা বুধবার কার্যকর হয়েছে বলে জানা গেছে।
চলতি মাসের ১৬ তারিখে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালককে ঘুষ দেওয়ার দায়ে পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমানকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামের জামিনের বিরুদ্ধে দুদকের শুনানিকালে আদালত দুদকের আইনজীবীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ডিআইজি মিজানকে এখনও গ্রেফতার করছেন না কেন? সে কি দুদকের চেয়ে বেশি শক্তিশালী?’
জবাবে দুদক আইনজীবী আপিল বিভাগকে জানান, ‘ওই ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। তদন্ত চলছে।’ পরে আদালত বলেন, ‘দুদক কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িত হওয়ার বিষয়টি অ্যালার্মিং।’
এদিকে বুধবার (২৬ জুন) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেই সদ্য সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ডিআইজি মিজানকে গ্রেফতার করা হবে। গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া সরকারি উচ্চপদস্থ কোনও কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেই সদ্য সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ডিআইজি মিজানকে গ্রেফতার করা হবে। এর আগে যদি তিনি আত্মসমর্পণ করেন। তাহলে ভিন্ন কথা। আর যদি না করেন তাহলে আইন আইনের প্রক্রিয়াতেই চলবে।’
ডিআইজি মিজান দেশে আছেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি দেশে নাই এরকম কোনও কিছু শুনি নাই। তার তো দেশেই থাকার কথা।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হবে। তার বিরুদ্ধে এক নারীকে জোরপূর্বক বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এছাড়াও, গত ১৯ জুন আদালত এক আদেশে মিজানুর রহমানের স্থাবর সম্পদ ক্রোক এবং ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় বিয়ে গোপন করতে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আছে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারকে প্রভাব খাটিয়ে গ্রেফতার এবং এক সংবাদপাঠিকাকে যৌন হয়রানির অভিযোগও আছে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া পুলিশের নিয়োগ, বদলিতেও একসময় ভূমিকা রাখতেন তিনি। গ্রেফতার ও মামলা দিয়ে হয়রানি করে টাকা আদায়ের অভিযোগও আছে মিজানের বিরুদ্ধে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার ছিলেন ডিআইজি মিজান। সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনারও ছিলেন তিনি। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ছিলেন। পরে সেখান থেকে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: