পানির জন্য দিনে ১৪ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয় তাদের

গোটা দেশে চলছে পানির জন্য হাহাকার। শিগগিরই দেশের ২১টি শহর পানিশূন্য হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এ বছরের গ্রীষ্ম শুরুর আগে থেকেই বারবার উঠে এসেছে মহারাষ্ট্রের নাম। এই সঙ্কটের সবচেয়ে বড় শিকার রাজ্যটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বারবার ভাইরাল হয়েছে ফেটে চৌচির চাষের জমির ছবি।
তীব্র এই পানি সঙ্কটে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে মহারাষ্ট্র। বিশেষ করে রাজ্যটির প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো। খাবার পানি সঙ্কট সেখানে তীব্রতর। বাইরে থেকে কোনো পানি আসে না সেসব এলাকায়। আশপাশের জলের উৎসগুলোও শুকিয়ে গেছে। ফলে ওই গ্রামের মানুষদের দূর–দূরান্ত থেকে পানি আনতে হয়। তবে বয়স্করা নয় ছোট্ট শিশুদের করতে হয় এই কাজ।
সম্প্রতি তেমনই এক ছোট কিশোরের ‘পানি যুদ্ধের’ গল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তা দেখার পর যেন মহারাষ্ট্রের পানি সঙ্কটের তীব্রতা আরও বেশি করে পৌঁছেছে অনেকের মধ্যে। সেই কিশোরের পানির জন্য সংগ্রামের রোজকার রুটিন নিয়ে আলোচনা করছেন অনেকেই।
জানা গেছে, ১০ বছরের ছেলে সিদ্ধার্থ ট্রেনে করে রোজ রঙ্গাবাদ নামক এক স্থানে যায়। সঙ্গে থাকে দুটি বড় পানির পাত্র। পরিবারের জন্য পানি সরবরাহের এই কাজ রোজ তাকেই করতে হয়। পড়াশোনা বন্ধ। খেলার সময়ও পায় না। সিদ্ধার্থ রোজ দুপুরে হেঁটে যায় রেলস্টেশনে। সেখান থেকে ট্রেনে সোজা রঙ্গাবাদ। স্টেশন থেকে পানি নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়। যাওয়া এবং আসা সব মিলিয়ে রোজ তাকে ১৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।
তবে এখানেই শেষ নয়। মাঝে মাঝেই সময়মতো ট্রেন আসে না। ফলে রেলস্টেশনে গাছের তলায় বসে থেকে অপেক্ষা করতে হয় সিদ্ধার্থকে। অবশ্য সে একা নয়। তার মতোই দেখা যায় ১২ বছরের ছোট্ট মেয়ে আয়েশা কিংবা সিদ্ধার্থ’র ছোট বোন ৯ বছরের সাক্ষীকেও। তারাও রোজ একই কাজ করে।
তবে ট্রেনে যাতায়াত করার টাকা পায় না তারা। তাই টিকিট ছাড়াই ট্রেনে উঠে পড়ে। ফলে অন্য যাত্রীরা বিরক্ত হয়। মাঝে মাঝে ট্রেনের ভেতরে উঠতে না পারলে দরজার সামনে কোনো মতে বসে থাকে। আসার সময় ভোগান্তি হয় সবচেয়ে বেশি। কেননা তখন তাদের কাঁধে আর হাতে থাকে দুটি পানির পাত্র। স্টেশনে ফেরার পর দীর্ঘ পথ হেঁটে সন্ধ্যায় বাড়ি পৌঁছায় তারা।
এদিকে তাদের বাবা-মা দুইবেলা ভাত জোটানোর কাজে ব্যস্ত। তাই ছেলেমেয়েদের ভীষণ পরিশ্রম করে পানি আনতে হয়। জানা যায়, সিদ্ধার্থদের গ্রামে ৩০০ পরিবারের বাস। কিন্তু সেখানে পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। গ্রামের আশপাশে যেটুকু ছিল, তা শুকিয়ে গেছে গ্রীষ্মে। বাধ্য হয়েই একটু পানির জন্য অত দূর পাড়ি দিতে হয় গ্রামটির ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে সিদ্ধার্থের কথা সামনে এলেও, এই ‘পানি যুদ্ধের’ খুদে সৈনিক কিন্তু সে একা নয়। মহারাষ্ট্রের একাধিক গ্রামের ঘরে ঘরে এমনই গল্প শুনতে পাওয়া যাবে। শুধু মাটি, পুকুর কিংবা গাছ নয়, তীব্র জলকষ্টে এসব শিশুর শৈশব-কৈশোরের মুহূর্তগুলোও যেন শুকিয়ে যাচ্ছে ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: