যে চক্রে উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল রেলওয়ে স্টেশনের অদূরের একটি পাহাড়ি ছড়া (খাল) হলো বড়ছড়া। চা বাগানের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত এই ছড়ার ওপর ছোট একটি রেলসেতু।
এই সেতুটি ভেঙে গিয়েই রবিবার রাতে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পড়ে সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেস। এ দুর্ঘটনায় নিহত হয় পাঁচজন, আহত হন দুই শতাধিক ব্যক্তি।
কিন্তু এতবড় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কে?
রেলওয়েসূত্র জানায়, বড়ছড়া সেতুটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। এরপর সর্বশেষ আর কবে এই সেতুর সংস্কার হয়েছে তা তাৎক্ষণিক জানাতে পারেননি রেলের লোকজনই।
স্থানীয়রা জানান, এই সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে জীর্ণশীর্ণ। এ ব্যাপারে আশেপাশের লোকজন অনেকবার রেলের লোকজনকে বিষয়টি অবহিত করলেও তারা কান দেননি।
অবশেষে এই সেতু ভেঙেই ঘটেছে সিলেট অঞ্চলের স্মরণকালের ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা।
রাতে ট্রেনের বগি উল্টে পড়ার পর উদ্ধারকাজে আসা পার্শ্ববর্তী নন্দননগর গ্রামের ফারুক মিয়া বলেন, ‘আমি অনেক আগেই দেখেছি, ব্রিজের পাত দুইটা ঠিকমতো লাগানো থাকে না। পর্যাপ্ত নাট-বল্টু নেই। গাড়ি যখন এই ব্রিজের উপর উঠে, তখন খালি (শুধু) কাঁপে।’
তিনি বলেন, রেল কর্তৃপক্ষ এই সেতুর ব্যাপারে আগেই নজর দেয়া উচিত ছিল। তাদের খামখেয়ালিতে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে।
একই গ্রামের নুরুল আমিন জানান, এই সেতুটি অত্যন্ত জীর্ণ। তাই ট্রেন পার হওয়ার সময় একটু কম গতিতে চাওয়া উচিত ছিল। মনে হয় দ্রুত গতিতে চলার কারণে সেতুটি ভেঙেছে।
তিনি জানান, স্থানীয়রা এই সেতুর ব্যাপারে নজর দেওয়ার জন্য একাধিকবার রেলের লোকজনকে বলেছিলেন।
রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেইন জানান, লাইনের দুর্বলতা কিংবা চাকার কম্বিনেশনের কারণে ঘটতে পারে এ দুর্ঘটনা।
তিনি জানান, একটি ট্রেনে সচরাচর ১২-১৪টি বগি থাকে। কিন্তু, দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেনটিতে বগি লাগানো হয়েছিল ১৭টি। প্রতিটি বগিতে সিট ছিল ৬৫টি। এ হিসাবে ট্রেনটিতে প্রায় ১ হাজার ১০৫ জন যাত্রী ছিলেন। এর বাইরে আরও অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ট্রেনে যাত্রী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ ছিল ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর সেতু বন্ধ থাকায় সরাসরি বাস চলাচল বন্ধ থাকা।
একারণে ট্রেনে যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ ছিল। এক হাজারেরও বেশি অতিরিক্ত যাত্রী উপবন এক্সপ্রেসে ওঠেন বলে জানা গেছে।
সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩ মিটার দীর্ঘ শাহবাজপুর সেতু ১৯৬৩ সালে তিতাস নদীর ওপর নির্মিত করা হয়। মঙ্গলবার এতেফাটল দেখা দেয়। এরপর বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত সেতুটি মেরামতে অন্তত ১০ দিন সময় লাগবে।
তার আগেই রোববার ঘটল দুর্ঘটনা।
দ্বিতীয় শাহবাজপুর সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তা চলছে।
উপবনের দুর্ঘটনা যেন একটি চক্রের মতো। যার এক মাথার সমস্যা দেখা দিলে অপর মাথায় তার প্রতিক্রিয়া হয় আরো বেশি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: