গাইবান্ধায় ৩০ বছরের রেকর্ড ভাঙল বন্যা

গাইবান্ধা পৌরসভা প্রায় ৩০ বছরের রেকর্ড ভেঙে বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে পৌরসভায় ৯টি ওয়ার্ড। শহরে বন্যা দেখা দেওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পৌরবাসী।
পৌর এলাকার পূর্বপাশ দিয়ে দক্ষিণের দিকে বয়ে যাওয়া আলাই নদীর ডান পাশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ না থাকায় এ বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিতরা ঠাঁই নিয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপরে এবং অনেকে আত্মীয়ের বাড়িতে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালের পর এবারই সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে গাইবান্ধা শহর। শুক্রবার বিকেল তিনটায় ঘাঘট নদীর পানি শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপদ সীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা যায়।
গত সোমবার সদরের খোলাহাটী ইউনিয়নের গোদারহাটে ঘাঘট নদীর বাঁধ ভেঙে প্রবল পানির স্রোত আলাই নদী দিয়ে প্রবেশ করেছে জেলা শহরে। ডুবে গেছে ডিবি রোড, ভিএইড রোড, বালাসী রোড, স্টেশন রোড, সার্কুলার রোডসহ শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো। বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে পৌর এলাকার অ্যাকোয়ারস্টেট পাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, কালিবাড়ীপাড়া, ডেভিড কোম্পানীপাড়া, প্রফেসর কলোনি, কলেজপাড়া, গোরস্থানপাড়া, মধ্যপাড়া, মাস্টারপাড়া, আদর্শপাড়া, মুন্সিপাড়া, পূর্বপাড়া, বানিয়ারজান, কুঠিপাড়া, জুম্মাপাড়া ও সবুজপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা। পানি প্রবেশ করেছে প্রধান কাঁচা বাজারের আড়ৎ, পুরাতন বাজারসহ কাচারি বাজার ও নতুন বাজারে।
শহরের রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় কোথায় গর্ত ও কোথায় ঢাকনা ছাড়া ফুটপাত রয়েছে এসব দেখতে না পেয়ে অনেকে পড়ে গিয়ে আহত হচ্ছেন। বন্যার পানি প্রবেশ করায় বন্ধ রয়েছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ফলে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কাজ করা শ্রমিক ও দিনমজুরদের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কাজকর্ম বন্ধ থাকায় অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
এদিকে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা জজের বাসভবনসহ সদর উপজেলা পরিষদসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কার্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে । ফলে পানিতে ভিজে কষ্ট করে কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
অনেক এলাকায় চার থেকে পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় দিন-রাত কাটছে বন্যার্তদের। পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ, সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় ও পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ১৭ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন আকন্দ বলেন, পুলবন্দির আলাই নদীর বামপাশে আশির দশকের শেষের দিকে বাঁধ নির্মিত হলেও অজ্ঞাত কারণে নির্মাণ করা হয়নি ডানপাশের বাঁধ। ফলে এবার পৌর এলাকায় পানি প্রবেশ করে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে আমাদের। বন্যার এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেকেরই আট থেকে দশ মাস লাগবে। এবার বন্যা শেষে আগামী বর্ষার আগেই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
গাইবান্ধা পৌরসভার প্যানেল মেয়র জি এম চৌধুরী মিঠু বলেন, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি পানি হয়েছে পৌর এলাকায়। যা ১৯৮৮ সালের চেয়ে অনেক বেশি।
গাইবান্ধা পৌরমেয়র শাহ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবীর মিলন বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে পাঁচ হাজার ১৫০ জন বন্যাকবলিত মানুষ। পৌরসভার পক্ষ থেকে তাদেরকে দুইবেলা খিচুড়ি, একবেলা শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্যালাইন, ওষুধ ও খাবার পানি বিতরণ করা হচ্ছে।
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গোদারহাটে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে ও আলাইয়ের ডান পাশে বাঁধ না থাকায় শহরে পানি প্রবেশ করেছে। নতুন বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে আমরা ভাবছি।
অপরদিকে বিপদ সীমার ওপরে থাকা ব্রহ্মপুত্র নদ ও ঘাঘট নদীর পানি কমতে শুরু করলেও ভেঙে যাওয়া বাঁধের অংশগুলো দিয়ে প্লাবিত হচ্ছে সদর, সাদুল্লাপুর, সাঘাটা, পলাশবাড়ী ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার নতুন নতুন এলাকা। এ ছাড়া তিস্তা নদীর পানি বিপদ সীমার নিচে থাকলেও হু হু করে বাড়ছে গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া নদীর পানি। শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৯ ঘণ্টায় করতোয়ার পানি বেড়েছে ৩৮ সেন্টিমিটার। বন্যার পানির প্রবল চাপে গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের বালুয়া এলাকায় বাঙালি নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে। এই পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হবে আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়ন। বন্যায় এ পর্যন্ত মারা গেছে সদর, সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জে ৫ জন।
দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বিশেষ সভায় অংশগ্রহণ করেন ও পরে ফুলছড়িতে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে ত্রাণ বিতরণ করেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: