জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা- খালেদা জিয়ার জামিন খারিজে যা ঘটল

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বুধবার দুপুরের পর শুনানি করে এই আদেশ দেন।
৩টায় শুনানির শুরু হওয়ার পর ৩টা ৪৫ মিনিটে জামিন শুনানি শেষ হয়। এরপর আদালত বলেন, আমরা পাঁচ মিনিটের জন্য বিরতিতে যাচ্ছি।
এরপর বিকেল ৪টায় আদালত এজলাশে বসেন। এ সময় বিএনপির শতাধিক আইনজীবী এবং সরকারপক্ষে অনেক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। সবাই আদেশের জন্য অধীর আগ্রহে এবং উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করতে থাকেন। আদালত কক্ষে পিনপতন নীরবতা।
এরপর আদালত আদেশ পড়া শুরু করে বলেন, ‌এ মামলায় আইনের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে। আপিল শুনানির জন্য বিবেচনাধীন রয়েছে। মামলা পর্যালোচনা করে আমরা জামিন আবেদন খারিজের আদেশ দিলাম।
আদেশের পরপর বিচারপতিরা এজলাস ছেড়ে যাওয়ার সময় বিএনপির অর্ধশতাধিক আইনজীবী ‘শেইম শেইম’ (লজ্জা) বলে চিৎকার দিতে থাকেন। ‘এ আদেশ মানি না, শেখ হাসিনার দালাল’ বলে এজলাস কক্ষে চিৎকার করতে থাকেন।
এ সময় কিছু জুনিয়র আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনকে ঘিরে ধরে বলেন, আপনি আন্দোলনের আদেশ দেন। আমরা আদালতে আন্দোলন করব।
মাহবুব উদ্দিন খোকন সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু সবাই হৈ চৈ করতে থাকেন। একপর্যায়ে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনকে জুনিয়র আইনজীবীদের রোষানলে পড়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এজলাস কক্ষে চুপচাপ বসে থাকেন। বিএনপির আইনজীবীরা বিচারকক্ষ ছেড়ে যাওয়ার পর তারা রাষ্ট্রপক্ষ এজলাস ত্যাগ করেন।
আদেশের আগে খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন মামলার নথি পড়ে আজো জামিন আবেদন করেন। এরপর আদালত রাষ্ট্রপক্ষকে বক্তব্য শুরু করতে বলেন।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মাই লর্ড, এ মামলায় নথি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, এখানে সর্বোচ্চ চাঁদাবাজি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে এ ধরনের চাঁদাবাজি করা খুবই অন্যায়। ট্রাস্ট করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু তাই বলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এ ধরনের কাজ করা খুবই অন্যায়। ট্রাস্টের নামে যে জায়গা কেনা হয়েছে তা তারেক রহমানের আত্মীয়র জায়গা। এ জায়গা কেনার ক্ষেত্রে জমির মূল্যের অধিক মূল্য দিয়ে কেনা হয়েছে।
এ মামলায় জামিন দিলে মানুষের মধ্যে ধারণা হবে অন্যায় করলেও সহজে পার পাওয়া যায়। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি হলেও জামিন পাওয়া যায়। এ ছাড়া খালেদা জিয়া অপর মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি। এ মামলায় আপিল শুনানি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তাই এ মুহূর্তে জামিন দেওয়া ঠিক হবে না।
এরপর আদালত শুনানি শেষে জামিন আবেদন খারিজের আদেশ দেন।
আদালতে মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, ব্যারিস্টার মীর নাছির, এ জে মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন শুনানি করেন। এ সময় বিএনপির অপর আইনজীবী নিতাই রায় চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল উপস্থিত ছিলেন।
দুদকের পক্ষে খুরশীদ আলম খান শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানি করেন।
গতকাল শুনানিতে খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি গুরুতর অসুস্থ। মামলার বাদী এজাহারে খালেদা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের টাকা আত্মসাৎ করেছেন—এ ধরনের কোনো কথা উল্লেখ করেননি। অথচ অভিযোগ গঠনের সময় তদন্ত কর্মকর্তা মিথ্যা তথ্য দিয়ে অভিযোগ গঠন করিয়েছেন। মামলার এজাহারে যদি অভিযোগ না থাকে,তাহলে দণ্ড দেওয়া যায় না। এরপরও তাঁকে এ মামলায় দুদক আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মানবিক বিবেচনায় তাঁকে যেন জামিন দেওয়া হয়।’
অন্যদিকে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান জামিনের বিরোধিতা করেন। দুপুর ২টা ২৫ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এ মামলায় খালেদা জিয়ার তিন আইনজীবী ও দুদকের আইনজীবী শুনানি করেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের পক্ষে সময় আবেদন করা হয়। এ কারণে আদালত আজ বুধবার দুপুর ২টা পর্যন্ত জামিন শুনানি মুলতবি করেন।
আদালত এর আগে নথি তলব করেছিলেন। নথি আসার পর আদালত জামিন শুনানির জন্য ৩০ জুলাই দিন নির্ধারণ করেছেন।
গত ২০ জুন বিচারিক আদালত থেকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার নথি বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আসে।
গত ৩০ এপ্রিল আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টের এ বেঞ্চ খালেদা জিয়ার করা আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। এ ছাড়া বিচারিক আদালতের রায়ের নথি দুই মাসের মধ্যে হাইকোর্টে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণা করেন পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৫-এর বিচারক ড. মো.আকতারুজ্জামান। রায়ে খালেদা জিয়াকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন। এই মামলায় অপর তিন আসামিকেও সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া আপিল করলে ৩০ এপ্রিল তা শুনানির জন্য গ্রহণ করে অর্থদণ্ড স্থগিত করেন হাইকোর্ট। গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে ছিলেন খালেদা জিয়া। বর্তমানে তিনি কারা হেফাজতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: