দুই সিটি কর্মকর্তাকে হাইকোর্ট- ‘মানুষ ডেঙ্গুতে আতঙ্কিত, আপনারা শুধু এখানে-সেখানে মিটিং করে যাচ্ছেন’

ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন জ্বরের বাহক এডিস মশা নির্মূল নিয়ে দুই সিটি কপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে তলবের শুনানিতে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘আপনারা শুধু এখানে-সেখানে মিটিং করে যাচ্ছেন আর সারা দেশের মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত। ঘরে ঘরে মানুষ আক্রান্ত। সবাই যদি হাসপাতালে যেত তাহলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেশি হতো।’
ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন জ্বরের বাহক এডিস মশা নির্মূল ও ধ্বংসে বিদেশ থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে ওষুধ আনার প্রক্রিয়া জানাতে বলেছেন হাইকোর্ট। আজ বৃহস্পতিবার বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে ঢাকা উত্তরের পক্ষে আইনজীবী তৌফিক ইনাম টিপু ও দক্ষিণের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাঈনুল হাসান।
সকাল পৌনে ১১টার দিকে শুনানি উপস্থিত হোন দুই সিটির দুই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। শুরুতে হাইকোর্ট অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের কাছে জানতে চান, ‘ডেঙ্গু নিয়ে এ বছর অ্যালার্মিং সিচ্যুয়েশন কেন হলো? এ ক্ষেত্রে কী সমস্যা,তা কি চিহ্নিত করেছেন?’
জবাবে মাহবুবে আলম বলেন, ‘চিন্তা করতে হবে। নিঃসন্দেহে বিষয়টা সবার হেলথ কনসার্ন। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনই বলুক, সেটাই ভালো হয়।’
এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো.শরীফ আহমেদ আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমার এই সিটি করপোরেশনে এক কোটির বেশি লোক বসবাস করেন। আর ১০টি জোনে ৭৫টি ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রমে জনবল রয়েছে মাত্র ৪২৯ জন।’
আদালত তাঁর কাছে জানতে চান, ‘এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এত বেশি কেন?’
জবাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব,আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো.শরীফ আহমেদ বলেন, ‘এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। ক্লাইমেট সেনসেটিভ ডিজিজ। আর এ বছর আমাদের দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত,সর্বোচ্চ আর্দ্রতা ও সর্বোচ্চ উষ্ণতা ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এর ভয়াবহ প্রভাব চলছে। ভিয়েতনাম,অফ্রিকা,থাইল্যান্ডসহ সব দেশেই ডেঙ্গু আছে।’
এ সময় আদালত বলেন, ‘ওষুধ কার্যকর হচ্ছে না কেন? গত বছর ওষুধ ছিটালে ঘরেও তার ঝাঁজ পেতাম। এবার গন্ধও পাওয়া যায় না। জনগণের ধারণা হচ্ছে এবারের ওষুধে কাজ হচ্ছে না।’
জবাবে এ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যখনই ওষুধ আমদানি করার পর সরকারি দুটি ল্যাবে টেস্ট করে পজেটিভ সার্টিফিকেট পেলেই তারপর ব্যবহার করি।’
জবাবে আদালত বলেন, ‘যখন দেখলেন ওষুধ কাজ করছে না তখন অন্য জায়গায় দ্রুত টেস্ট করবেন না? এসব কি আমাদের বলে দিতে হবে? হোয়াট ইজ দ্য প্রবলেম? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সারা দেশের স্বাস্থ্য দেখবে। এগুলো আমরা দেখতে চাই না। অবস্থা যে রকম যাচ্ছে এটা কেবল সিটি করপোরেশনের উপর ছেড়ে দিলে হবে না। বিষয়টা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দেখতে হবে।’
এরপর উত্তর সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমরা পুরো ওষুধটাই চেঞ্জ করব। এজন্য একটি কারিগরি কমিটি করেছি। সমস্যা হচ্ছে,পিপিপির (পাবলিক প্রাইভেট প্রকিউরমেন্ট) মাধ্যমে করতে হয়। সেখানে অনেক সময় লাগে। তবে ডিপিএমর মাধ্যমে কিনলে তাড়াতাড়ি পেয়ে যাব। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ দিন আবার দ্রুত আনলে ১৫ দিন সময় লাগবে।’
আদালত বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে ওষুধ আনবেন। আমরা আদেশ দেব। আমরা ওষুধ চাই। কত দ্রুত এবং কী প্রক্রিয়ায় আনবেন সেটা আমরা জানি না। হলফনামা আকারে আপনার আইনজীবীকে আমাদের জানাতে বলেন।’
এ সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন আদালতে বলেন, ‘আমরা আগামী রোববার মিটিংয়ে বসে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।’ তখন আদালত বলেন, ‘আপনারা আজকে বিকেলে মিটিং করবেন।’

জবাবে এ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘বিকেলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে আমাদের মিটিং রয়েছে।’

তখন আদালত বলেন, ‘আপনারা তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে রাতে মিটিং করেন। ফোনে কথা বলেন। আমরা চাই দ্রুত নতুন ওষুধ আনবেন। আপনারা শুধু এখানে-সেখানে মিটিং করে যাচ্ছেন আর সারা দেশের মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত। ঘরে ঘরে মানুষ আক্রান্ত। সবাই যদি হাসপাতালে যেত তাহলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেশি হতো।’
এরপর আদালত কোন প্রক্রিয়ায় বিদেশ থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে ওষুধ আনা হবে তা দুপুরের মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে হলফনামা আকারে জানাতে মৌখিক আদেশ দেন।
গত ২২ জুলাই তাঁদের তলব করেছিলেন হাইকোর্ট। এ কারণে এডিস মশা নির্মূল ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাইকোর্টে হাজির হন।
বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শরীফ আহাম্মেদ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন আদালতে হাজির হন।
গত ১৪ জুলাই এডিস মশা নির্মূল ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ঢাকা শহরে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ একই ধরনের অন্যান্য রোগের বিস্তার রোধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতেও বিবাদীদের বলা হয়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: