মানছেন না রায়, হাইকোর্টকেও হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন প্রভাবশালীরা!

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনিয়ম ও অসঙ্গতির ঘটনা আদালতের নজরে এনে জনস্বার্থে রিট করেন আইনজীবীরা। আদালতও সেই ঘটনাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আদেশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু কখনও কখনও দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ রায়ও আমলে নেন না প্রভাবশালীরা! অনেক সময় হাইকোর্টকেও তারা হাইকোর্ট দেখিয়ে ছাড়েন। আদালতের কাজ হলো আদেশ দেয়া, কিন্তু সেটা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়তই উদাসীনতা, নিষ্ক্রিয়তা ও অবহেলার পরিচয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রাজনৈতিক মদদপুষ্ট প্রভাবশালীদের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। যদিও দেশের সব্বোর্চ আদালতের নির্দেশনা পালন করা সবার জন্য বাধ্যতামূলক এবং সেটা না মানলে সেটি হবে আদালত অবমাননার শামিল। আর নিয়ম অনুযায়ী আদেশ অমান্যকারী এসব প্রভাবশালীরা যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন, নির্দেশনা অমান্যকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে জনসাধারণকে আরও সচেতন হতে হবে বলেও মনে করছেন তারা।
গত বছরের ২৮ এপ্রিল মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে কথা কাটাকাটির জেরে গ্রিনলাইন পরিবহনের বাসচাপায় পা হারানো রাসেল সরকারকে ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা রিটে আদালত শুনানি শেষে গ্রিনলাইন কর্তৃপক্ষকে রাসেল সরকারকে ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করেননি গ্রিনলাইনের মালিক হাজী মো: আলাউদ্দিন। এমনকি আদালতের আদেশের পরেও হাজির হননি তিনি। এ ব্যাপারে আদালত ৪ বার আদেশ দিলেও আদালতের কোনও আদেশই বাস্তবায়ন করেনি গ্রিনলাইন কর্তৃপক্ষ।
সাভারের আমিনবাজারে বিলামালিয়া ও বলিয়ারপুর মৌজায় অবৈধভাবে বালুভরাট করে দখল করা মধুমতি মডেল টাউন প্রকল্প অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিল হাইকোর্ট। প্রায় সাত বছর আগে দেয়া রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে মেট্রো মেকার্স ডেভেলপার্স লিমিটেড ও কয়েকজন পাল্টা মালিকের করা আবেদন (রিভিউ) খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। রাজউকের অনুমোদন ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়াই মেট্রো মেকার্স ডেভেলপার্স লিমিটেড বন্যাপ্রবণ এলাকায় মধুমতি মডেল টাউন হাউজিং প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৪ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে বেলা। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল জারির পাশাপাশি প্রকল্পের কাজে স্থগিতাদেশ দেন হাইকোর্ট। আর রুলর ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ২৭ জুলাই হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ মধুমতি মডেল টাউন প্রকল্প অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। কিন্তু রায়ের ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। এখনও আগের মতো বেপরোয়াভাবেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে মধুমতি মডেল টাউন কর্তৃপক্ষ।
গত বছরের ৩ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারার কাছে বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারানো রাজিব হাসপাতালে মারা যায়। পরে রাজিব হাসানের পরিবারকে কেন ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না এই মর্মে একটি রিট দায়ের করা হয়। গত ২০ জুন রাজিবের পরিবারকে ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ক্ষতিপূরণের মোট অর্থের মধ্যে ২৫ লাখ টাকা স্বজন পরিবহনের মালিকপক্ষ আর বাকি ২৫ লাখ টাকা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনকে (বিআরটিসি) দিতে বলা হয়। এই টাকা দুই মাসের মধ্যে রাজিবের পরিবারকে পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। কিন্তু প্রথম মাস পার হলেও এখনও রাজিবের পরিবারের সাথে কোনও যোগাযোগ করা হয়নি। রাসেলের মত রাজিবের পরিবারেরও ক্ষতিপূরণের টাকাও না পাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
গত বছরের ৩ ডিসেম্বর ভিকারুননেসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীকে পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন সঙ্গে নেয়ার অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়। এরপর স্কুল কর্তৃপক্ষ ওই ছাত্রীর বাবা-মাকে ডেকে পাঠালে তারা মেয়ের হয়ে দফায় দফায় ক্ষমা চান। কিন্তু এরপরও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাদের অপমান করেন এবং স্কুল থেকে অরিত্রীকে ছাড়পত্র দেয়ার ঘোষণা দেন। নিজের সামনে বাবা-মায়ের এমন অপমান সইতে না পেরে ওইদিন শান্তিনগরের বাসায় ফিরে গলায় ওড়না দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে ওই ছাত্রী। অরিত্রী আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় গ্রেফতার হন শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনা। পরে তিনি জামিন পান। এদিকে নিজের চোখের সামনে বাবা-মায়ের অপমান সইতে না পেরে অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা নজরে এনে রিট করা হলে বিষয়টিকে হৃদয়বিদারক বলে মন্তব্য করেন হাইকোর্ট। বর্তমানে রিটটি হাইকোর্টে শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। অরিত্রীর আত্মহত্যার মতো এমন অনেক ঘটনা সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অহরহ ঘটছে। ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও এর কোন সুষ্ঠু বিচার পাননি তার পরিবার। বিভিন্ন সময় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী সংক্রান্ত বিভিন্ন আদেশ, রায় ও নির্দেশনা দেন উচ্চ আদালত। কিন্তু এসব নির্দেশনা আদতে পুরোপুরি পালন ও বাস্তবায়ন হয় না।
২০১১ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট রায় দেন। শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ বন্ধে একই বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আদেশ জারি করে। ২০১৩ সালের শিশু আইনের ৭০ ধারাতেও শিশুকে আঘাত বা অবহেলাসহ মানসিক বিকৃতির শিকার হলে তাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল শিশুদের প্রতি এ ধরনের নিষ্ঠুরতার অবসান হয়নি। মানা হয়নি উচ্চ আদালতের আদেশও।
গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকারের জারি করা নীতিমালাকে বৈধ ঘোষণা করে এ রায় দেন হাইকোর্ট। নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতিসাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোটের ডিভিশন বেঞ্চ এ রায় দেন। কিন্তু সবক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের এ রায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রতিকারের জন্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। পরে ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি হাইকোটের একটি বেঞ্চ এক আদেশে প্রেসক্রিপশন পড়ার উপযোগী করতে ও প্রয়োজনে কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে প্রেসক্রিপশনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ ও রুল জারি করে। কিন্তু হাইকোটের ওই আদেশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
ঢাকার রাস্তার যানযট কমাতে মতিঝিল, গুলিস্থান , পল্টন, সদরঘাট এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে একাধিকবার হাইকোর্ট থেকে আদেশ ও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এ ব্যাপারে ২০০১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হাইকোটের একটি বেঞ্চ এক রায়ে রাজধানীর ফুটপাত ও চলাচলের পথকে জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী এবং পথচারীদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছিল।তাও কার্যকর হয়নি।
গত বছর রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধসহ জনগুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন সময়ে রিট আবেদন করা হয়। এসব মামলায় বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনাও আসে। পরে হাইকোর্ট সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গত ২৪ জুন ঢাকাসহ সারা দেশে লাইসেন্স নিয়ে ফিটনেস বন্ধ ও নবায়ন না করা গাড়ি ও লাইসেন্স নিয়ে নবায়ন না করা চালকদের বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছিলেন হাইকোর্ট।
একইসঙ্গে সারাদেশে লাইসেন্সধারী ফিটনেসহীন ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৩৬৯ গাড়ি এবং লাইসেন্স নিয়ে নবায়ন না করা চালকদের বিরুদ্ধে বিআরটিএ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তাও জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। বিআরটিএ ফিটনেসবিহীন গাড়ির তালিকা দিলেও এখনো বন্ধ কর করা হয়নি এসব ভাঙাচুরা গাড়ি।
২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বর শিশুর ঘাড়ে বইয়ের বোঝা প্রাথমিক স্কুলের শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারি স্কুলব্যাগ বহন নিষেধ করে সুনির্দিষ্ট একটি আইন প্রণয়ন করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। রায় পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে আইন করতে আইন সচিব, শিক্ষা সচিব, গণশিক্ষা সচিবসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন এখনো চোখে পড়েনি।
শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানি, সহিংসতা রোধে ২০১০ সালে একটি নীতিমালা করে দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এতে বলা হয়েছিল, যতদিন পর্যন্ত যৌন হয়রানির কোনও আইন পাস না হবে ততদিন পর্যন্ত হাইকোর্টের এ নীতিমালা অনুসরণ করা হবে। এদিকে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোটের নির্দেশনা অনুসারে কমিটি করা হয়েছে কিনা জানতে চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। ২৯ এপ্রিল আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ রিটটি দায়ের করেন।
এ বিষয়ে ৫২টি ভেজাল পণ্য নিয়ে রিট করা আইনজীবী ব্যারিস্টার সিহাব উদ্দিন খান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘জনস্বার্থে অনেক রায় ও আদেশ দিলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন হয় না। কারণ আদালতের কাজ বিভিন্ন বিষয়ে আদেশ ও নির্দেশ দেয়া। কিন্তু সেটা বাস্তাবায়ন করার দায়িত্ব আদালতের না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয় যদি এ বিষয়ে অধিকতর সর্তক থাকে তবে জনস্বার্থে করা এসব রিটের কার্যকারিতা অবশ্যই আসবে।’
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোররেশদ মনে করেন, ‘উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন করাও একটি আইনি দায়িত্ব। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই দায়িত্ব খর্ব করাও অপরাধের শামিল। জনস্বর্থে করা রিটে আদালতের রায়ে দেশের সকল মানুষেরই সুফল হয়। তাই এটার বাস্তবায়ন অতি জরুরি। সুপ্রিম কোটের নির্দেশনা পালন সবার জন্য বাধ্যতামূলক এবং তা অবজ্ঞা করা আদালত অবমাননার শামিল। এ কথাটি অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে।’

Leave a Reply

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

%d bloggers like this: