রোহিঙ্গা সংকটে ‘ব্রেক থ্রু’ অগ্রগতি দেখছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা এর আগে কখনোই দেশটির কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে নাগরিকত্ব ইস্যুতে আলাপ করতে পারেনি। তবে গত দুই দিনে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিবের সর্বশেষ কক্সবাজার সফরে সেই সুযোগ পেয়েছেন তারা। এ ঘটনাকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ‘ব্রেক থ্রু’ অগ্রগতি হিসেবে মনে করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন।
রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে মিয়ানমার বলছে, তারা প্রথমে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি পরিচয়পত্র দেবে। এর মধ্য দিয়েই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এটি একটি ‘ব্রেক থ্রু’ অগ্রগতি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সোমবার (২৯ জুলাই) কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এমন মন্তব্য করেন।পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এবার রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে নাগরিকত্ব বিষয়ে আলাপ করতে পেরেছে, যা এর আগে কখনো তারা করতে পারেনি। আমি এই ঘটনায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ব্রেক থ্রু অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি।’
ড. আবদুল মোমেন জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে তিনি এখনো আশাবাদী। তবে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা এটা বিশ্বাস করেন না বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যবাসন চাই। এ জন্য মিয়ানমারকে প্রস্তাব দিয়েছি, তারা রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যবাসন প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিবেশী আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করুক। মিয়ানমার প্রয়োজনে তাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ও চীনকেও এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করুক। আমাদের এই প্রস্তাবে মিয়ানমার ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘রোহিঙ্গারা গো ধরেছে, নাগরিকত্ব না পেলে তারা মিয়ানমার ফিরে যাবে না। এ বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। তারা আমাকে বলেছে, নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য মিয়ানমারে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পেতে হলে ওই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তারা ১৯৮২ সালের আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব দিয়ে থাকে। মিয়ানমার যখন নাগরিকত্ব দিয়েছে তখন রোহিঙ্গারা আবেদন করেনি, সরকারের আইন অমান্য করেছে। আবেদন করলে তখনই নাগরিকত্ব পেয়ে যেত তারা।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পেতে হলে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। প্রক্রিয়ার মধ্যে না গেলে মিয়ানমার হুট করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে পারবে না। এবার মিয়ানমার বলেছে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য প্রক্রিয়ায় ঢুকতে হবে (পাথ ওয়ে টু সিটিজেনশিপ)। মিয়ানমার এখন নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে তারা প্রথমে রোহিঙ্গাদের কার্ড দেবে। কার্ড দেওয়ার পর কিছু প্রক্রিয়া আছে, সেগুলো অনুসরণ করে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব (ন্যাচারাল সিটিজেনশিপ) পাবে।’
‘এইটা হচ্ছে ব্রেক থ্রু। তারা যে রাজি হচ্ছে (নাগরিকত্ব দিতে)— এটা মোর দেন এনাফ। এটাকে আমি অগ্রগতি মনে করি। কারণ আগে নাগরিকত্ব বিষয়ে আলাপই করা যেত না,’— বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
নাগরিকত্বের অগ্রগতির বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার আলাপ করেছে কি না— জানতে চাইলে ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে নয়, মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে এই আলাপ করেছে। আমরা তাদের এই নাগরিকত্বের ঝামেলার মধ্যে নেই। আমরা চাই, নিরাপদ ও সম্মানের সঙ্গে প্রত্যাবাসন। নাগরিকত্ব ইস্যু মিয়ানমার ও রোহিঙ্গাদের। আমরা রোহিঙ্গাদের বলতে চাই যে এটা তোমাদের সঙ্গে তোমাদের মিয়ানমার সরকারের বিষয়। তোমরা (রোহিঙ্গা) তোমাদের সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে যা করার করো, এর মধ্যে আমরা নেই।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এখন পর্যন্ত মোট ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা বাংলাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মিয়ানমারকে দিয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৮ হাজার রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার যাচাই-বাছাই করেছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আগে এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াতেও অনেক সমস্যা ছিল। এখন তা কেটে গেছে। আশা করছি এখন থেকে দ্রুততার সঙ্গে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলবে।’
আসছে আগস্ট মাসে বা জাতিসংঘ সম্মেলনের আগেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে বলে আশা করেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি এখনও আশাবাদী। চীন এ বিষয়ে সহায়তা করছে। তারাও (চীন) মনে করে যে অনেকদিন রোহিঙ্গারা এখানে থাকলে অস্থিরতা তৈরি হবে। মিয়ানমার আমাকে রাখাইনে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমি বলেছি, আমি রাখাইনে যাব, কিন্তু তার আগে প্রথম ব্যাচের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হোক। এরপর আমি তাদের দেখতে যাব যে তারা কেমন আছে।’
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে প্রাণে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে থাকেন রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি শিবিরে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন। মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও একাধিকবার চেষ্টা করেও বাস্তুচ্যুত এই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি। এর মধ্যে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের তালিকাও তৈরি করেছিল মিয়ানমার। সেই তালিকায় থাকা রোহিঙ্গারাও নিজভূমে ফিরতে পারেননি।

Leave a Reply

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

%d bloggers like this: