নন্দিত নরকে

ইমরুল শাহেদ

মোঘল রাজা-বাদশাহরা পরিবার পরিজন নিয়ে রাজধানী দিল্লী ফেলে হাওয়া বদলাতে যেতেন কাশ্মীরে। এখনো সেই শালিমার, নিশাত বাগ ডাল লেকের কিনারায় ফুলের ঢালি সাজিয়ে পর্যটকদের চোখ আর মন জুড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেতেন কাঞ্চনজঙ্গার পাদদেশে অথবা দার্জিলিং এর শীতল হাওয়া মাখাতে। মূলত হাওয়া বদল মানে স্বাস্থ্যকর স্থানে কিছুদিন ভ্রমণ করা। যেখানে থাকেনা দূষণ এবং প্রকৃতির বিরূপ প্রতিক্রিয়া।
একদা আমাদের দেশের ৬৩ জেলার মানুষ একটু ছুটি পেলেই পঙ্গপালের মত হাওয়া বদলাতে চলে যেতেন পর্যটন শহর খ্যাত ককসবাজারে, যেটি দেশের স্বাস্থ্যকর স্থান হিসেবে স্বীকৃত ছিল। পরিবার পরিজন নিয়ে তারা আসত- বৌ বাচ্চার হাত ধরে ঝাউ বনের ফাঁকে ফাঁকে আনন্দ চিত্তে ছুঁটে বেড়াত, বুক ভরে বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিত, আর হাত পা ছড়িয়ে সমুদ্রের পানিতে গোসল করে মুগ্ধ হয়ে যেত। সন্ধ্যার পর বার্মিজ মার্কেট থেকে বার্মিজ স্যান্ডেল, আচার, চন্দন কিনে হাত ধরাধরি করে শহর পদব্রজে পরিভ্রমণ করত।
সব কিছুই এখন অনেকাংশেই অতীত। কারণ, কেউ এখন ককসবাজারে আসলেই যেন পালিয়ে বাঁচে। সেই স্বাস্থ্যকর ককসবাজার আর নাই, এখন এটি দূষিত শহর, নোংরা শহর, অস্বাস্থ্যকর শহর।

আমরা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রিভিউ দেখুন। ওয়াক থুঃ আর ছি ছি করছে সারা দেশের মানুষ। আর স্থানীয় জনগণ? তারা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছে আপনাদের কাছ থেকে দ্রুত ভাল কিছুর পাওয়ার আশায়। তবে তারা আর বাতাসের গুঞ্জন আর খোকা ভুলানো গল্প শুনতে চায় না।

আপনারা দেখুন শহরের রাস্তাঘাটগুলো, যেন গরম পানিতে ঝলসে যাওয়া রাস্তার নেড়ি কুকুর। খুরুশকুল রাস্তার মাথা থেকে ভোকেশনালের গেইট পর্যন্ত দোযকে পরিণত হয়েছে। সারাক্ষণ হাঁটু পানি, গভীর গর্তে কোন না কোন গাড়ি আটকে থাকে। আলীর জাহাল মসজিদের সামনে, সিটি কলেজের সামনে, সাব মেরিন ক্যাবল স্টেশনের সামনে, কক্স টুডে হোটেল সড়কের মাথায়, বাজার ঘাটার প্রায় সব গলিতে একটু বৃষ্টি হলেই হাঁটু পানি জমে যায়, প্যাঁচপ্যাচে কাঁদা আর ময়লা আবর্জনায় পথের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। আমরা জানি আপনারা একই রাস্তা দিয়ে চলাচল করেন। আপনাদের বাচ্চারা-পরিবারের সদস্যদেরও সে পথ অনিচ্ছাকৃতভাবে মাড়ায়। হয়তো আপনারাও জেনে, শুনে, বুঝে হজম করছেন। নিরুপায় হয়ে আছেন। কিন্তু আপনাদেরকে দ্রুত উপায় বের করতে হবে, কারণ আপনাদের চোখের মণি, আপনাদের বিশ্বাসের, আস্থার জনগণ খুব কষ্ট পাচ্ছে।

দেখুন, সমস্ত শহর যেন আবর্জনার ডিপো। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজপথ ময়লাপথে রূপ নেয়। অগভীর ড্রেনগুলোর বাধাপ্রাপ্ত পানির প্রবাহ উপচিয়ে সমস্ত ময়লা আবর্জনার স্তুপে সয়লাব হয়ে যায় রাস্তাগুলি। পঁচা গন্ধ, কাঁদা আর ফুটপাত ছাড়া পথ কতক্ষণ সম্মান বাঁচিয়ে চলা যায়?

রোহিঙ্গা আসার পর ককসবাজারের সামাজিক মূল্য, আর্থিক মূল্য এবং বৈশ্বিক মূল্য বেড়েছে বহুগুণ। হাজার হাজার ভলান্টিয়ার এবং ভিআইপিদের পদচারণায় উখিয়া-টেকনাফ সড়ক ব্যস্ত। অথচ উখিয়া টেকনাফ সড়কে প্রবেশ করতে দুটি সড়কই উন্নয়নের কাজে অবরুদ্ধ। বিশেষ করে কলাতলী ডলফিন মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভ অভিমুখী প্রবেশ সড়ক আরসিসিতে রূপান্তর করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। পথ চলতেই হবে সে কারণে বহু গাড়ি সমুদ্রের ধার ঘেঁষে আসতে গিয়ে নরকে নিক্ষিপ্ত হয় মাঝেমাঝে। জোয়ারের পানিতে গাড়ি ভাসে, বালির গর্তে চাকা দেবে যায়। এর কি কোন দরকার ছিল? এমন করলে হত না, ১৮ ফিট রাস্তার অর্ধেক অর্ধেক ঢালাই দিয়ে সকাল থেকে দুপুর শহর থেকে মেরিন ড্রাইভমুখী আর দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মেইন ড্রাইভ থেকে শহরমুখী হালকা যান (মাইক্রো, কার, টমটম, রিকশা) চলাচল ঠিক রেখে? অথবা সপ্তাহের জোড় দিনগুলি একমুখী চলাচল রাখা যেত না? অথবা প্রি কাস্ট ব্লক বানিয়ে স্ল্যাব বসানো যেত না আনোয়ারা ইপিজেডের অভ্যন্তরীণ রাস্তার মত? যতদিন এই রাস্তা কিছুটা যাতায়াতের উপযুক্ত হবে না, ততদিন যে কোন পর্যটক কেন যাবেন ককসবাজারে? যে পর্যটক মেরিন ড্রাইভ রোড দেখে নি, সে কি আসলেই ককসবাজার দেখেছে? সুগদ্ধা বীচ আর সী গাল সড়কের সামনের রাস্তা দিয়ে কোন সুস্থ মানুষ হেঁটে বা গাড়িতে চড়ে যেতে পারবে? সম্ভব? নাকি এখানেও আরসিসি ঢালাই চলছে?

টার্মিনালকে বানিয়ে ফেলা হয়েছে হাঁসের কল্লার মত। যে যাবে, আটকাবেই। এমন অদ্ভুত শহরের প্রবেশ পথ সারা দেশে কেন, সারা পৃথিবীতেই কেউ দেখাতে পারবে না। এখন নতুন বিষফোঁড়া লিংক রোড। এই ত্রিমোহনায় কার ইশারায় কে গাড়ি থামায়, কে গাড়ি চালায়, কে গাড়ি বন্ধ রাখে- গবেষনার বিষয়। তার উপর সাপ্তাহিক দুই দিন মহাসড়কের উপর বাজার আর পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি যেন মানুষের গালে ঠাশ ঠাশ শব্দে থাপ্পড় মারছে সকাল বিকেল। দেখার, বলার, সরানোর কেউ নেই?

ককসবাজারের জন্য কি ফান্ডের অভাব? পরিকল্পনার অভাব? নাকি সমন্বয়, বাস্তবায়ন আর ম্যান অব পাওয়ার হাউজের অভাব? এমন পঁচা শহর ৬৩ জেলা শহরে ভ্রমণ করে দেখেন তো, আছে কিনা?

আপনারা ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ মহোদয়গণ সবসময় বিদেশে সফর করেন পরিবার পরিজন নিয়ে। বিশ্বের নানা সমুদ্র সৈকতের জন্য বিখ্যাত শহরে যান। আপনারা বলুন, সেই শহরগুলোর সাথে আমাদের ককসবাজারের কি কি পার্থক্য? যদি প্রশ্ন করি-

• ককসবাজারে কি কোন আন্ডার গ্রাউন্ড সুয়ারেজ লাইন আছে?
• সেন্ট্রাল ওয়াটার সাপ্লাই আছে?
• মেট্রো/ট্রাম/রেডবাস,গ্রীনবাস/মেট্রো টেক্সি সার্ভিস আছে?
• শহরের রাস্তায় রাতের আঁধারে হাঁটায় নিরাপত্তা আছে?
• হোটেল-রেষ্টুরেন্টগুলো যে টাকা নেয় সে টাকার সেবা ফেরত দেয়? কে তদারকি করে?

আসলে প্রশ্নের কোন শেষ নেই। এত প্রশ্নের ভীড়েও আমরা জনগণ বলতে চাই, আমাদের আবেগ বেশি। নুন্যতম নাগরিক সুবিধা পেলেই আমরা শান্ত এবং খুশি। আপনাদের প্রতি আমাদের সম্মান, শ্রদ্ধা এবং সমর্থনের কমতি থাকবে না। কিত্নু আপনারা যদি জবাবদিহিতার ঊর্দ্ধে উঠে যান, দায় বহন করতে অস্বীকৃতি জানান- সেক্ষেত্রে আমরা বিদ্রোহী, প্রতিবাদমুখর।

ইমরুল শাহেদ
প্রকৌশলী

Leave a Reply

%d bloggers like this: