আরেকটি ফিলিস্তিন হচ্ছে কাশ্মীর?

ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কটা গত দশকেও ছিল স্বাভাবিক, দহরম-মহরমের বালাই ছিল না। কিন্তু গত বছর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘বন্ধু’ বলে ভারতের প্রধানন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বুকে জড়িয়ে ধরার পর হালে সম্পর্কের মাখামাখিটা বেশ চোখে পড়ার মতোই। বাণিজ্যিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি নেতানিয়াহুর কাছ থেকে ‘বন্ধু’ মোদি যে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘুতে রূপান্তেরের বুদ্ধি ধার নিয়েছেন তা গত ৬ আগস্ট কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পদক্ষেপে বোঝা গেছে।
ইসরায়েলের ফিলিস্তিন দখল ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিষয়টি সহজেই বোঝা যাবে। ১৯১৭ সালে তুরস্কের কাছ থেকে ফিলিস্তিনের ওপর প্রশাসনিক ক্ষমতা পাওয়ার সময় সেখানে বসবাসকারী ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশ। ওই সময় মুসলিম জনগোষ্ঠীর হার ছিল প্রায় ৮৭ শতাংশ। ২০ বছরের মাথায় ইহুদিদের হার গিয়ে ঠেকে ১৭ শতাংশে। ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইহুদি রাষ্ট্র গঠনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে দরিদ্র ইহুদিদের আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে পাঠানো হয় ফিলিস্তিনে। ইহুদিবাদী সংগঠনগুলো গাঁটের পয়সা খরচ করে এসব ইহুদিদের জায়গা-জমি কিনে দিতে শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রায় এক দশক পর আরবরা যখন বিপুল সংখ্যক ইহুদি অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলেছিল ব্রিটিশদের কাছে তখন চক্ষুলজ্জায় কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করেছিল ব্রিটিশ। তবে ওই সময়েও অভিবাসন বা অনুপ্রবেশ বন্ধ ছিল না। এ ক্ষেত্রে ইহুদি শিক্ষার্থীরা হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের পড়তে এসে আর ফিরে যেত না। অভিবাসী ইহুদি নারীরা ফিলিস্তিনের ইহুদি বাসিন্দাদের বিয়ে করে স্থায়ী হয়ে থেকে যেত। আবার কেউবা পর্যটক হয়ে প্রবেশ করে ফিরে যাওয়ার নামগন্ধটি নিতো না। এই প্রক্রিয়াতে কেবল ১৯৩৫ সালে পাঁচ হাজার ইহুদি ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে।
১৯৪৮ সালে ইহুদিরা ইসরায়েলকে যখন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে তখন ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩ শতাংশে, যাদের অধিকাংশই অবৈধ অভিবাসী। আর মুসলমানদের সংখ্যা ততদিনে কমতে কমতে ৬০ শতাংশের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। ইঙ্গ-মার্কিনি শক্তির জোরে দখলদার ইহুদিদের হার এখন ইসরায়েলে প্রায় ৮০ শতাংশ।
সংখ্যাগুরু মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে রীতিমতো বিশ্বাসঘাতকতা করেই ১৯৪৭ সালে ভারতের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন কাশ্মীরের রাজা রাজা হরি সিং। তবে রাজার মৌখিক শর্তের ভিত্তিতে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদে কাশ্মীরকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়। এর রেশ ধরেই ১৯৫৪ সালের রাষ্ট্রপতির নির্দেশে সংবিধানে কার্যকর হয় ৩৫ এর ক ধারা। এই ধারানুসারে,কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দা কে হবে, সেটা নির্ধারণ করতেন রাজ্যের আইনপ্রণেতারা। কোনো রাজ্যের বাসিন্দা কাশ্মীরের কোনো সম্পদের মালিক হতে পারতেন না। এমনকি কাশ্মীরের কোনো নারী ওই রাজ্যের বাইরের কাউকে বিয়ে করলে তিনিও সেখানকার সম্পত্তির অধিকার হারাতেন।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরে মোট জনসংখ্যার ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ মুসলমান এবং ২৮ দশমকি ৪ শতাংশ হিন্দু। ১৯৬১ সালে রাজ্যের প্রথম আদমশুমারিতে দুই সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর হার ছিল প্রায় একই।
জমির সঙ্গে মানুষ ও দখলের একটি জটিল সম্পর্ক রয়েছে। দখল যার, জমি তার, জমি যার, জোর তার। সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫ এর ক অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে মোদি সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলো, কাশ্মীরের জমি এখন যে কেউ কিনতে পারবে। বিষয়টা ঠিক ইহুদিদের ফিলিস্তিন দখলের মতো। আগে জমি কেন, এর মাঝেই চলবে স্থানীয়দের উচ্ছেদ।
লন্ডনভিত্তিক জাস্টিস ফাউন্ডেশনের কর্ণধার অধ্যাপক নাজির আহমেদ শল বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, ‘ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল কাশ্মীরের জন্য যে ‘ডোভাল ডকট্রিন’ ফর্মুলেট করেছিলেন তার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনাই ছিল ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে লোকজনকে কাশ্মীরে এনে বসত করানো।’
উত্তর প্রদেশসহ অন্যান্য প্রদেশগুলোতে মোদি-অমিতের সেনারা প্রথমবার গরুর মাংস ইস্যুতে এবং হালে জয় শ্রীরাম স্লোগান ইস্যুতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের মেরেকেটে দেশছাড়ার রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে বন্দুকের নলের মুখে থাকা কাশ্মীরের মুসলমানদের এবার রাস্তা দেখানো নয় বরং সোজা দেশছাড়া করবে তা বোঝাই যাচ্ছে। কাশ্মীরকে যে আরেকটি ফিলিস্তিন হওয়ার দিকে যাচ্ছে সেটা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার করে দিলো মোদি সরকার।

Leave a Reply

%d bloggers like this: