বাংলাদেশের মতে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং বাংলাদেশ কখনো দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রতি ক্ষতিকারক কিছু সমর্থন করে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশি কর্মকর্তারা।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ গত ২৬ জুলাই তুরস্ক সফরকালে তুর্কি বার্তাসংস্থা আনাদুলোর সাথে এক সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য ‘হয় নাগরিকত্ব, না হয় আলাদা রাজ্যের’ দাবি জানান।
মাহাথির বলেন, “মিয়ানমার এক সময় ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ উপনিবেশিকরা শাসন করার জন্য রাজ্যগুলোকে একত্র করে। এর ফলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ একক বার্মার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে।”
তিনি বলেন, “এখন মিয়ানমার তাদেরকে হয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, না হয় তাদেরকে আলাদা রাজ্য গঠনের জন্য একটি অঞ্চল দিতে হবে।”
এর প্রতিক্রিয়ায় তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ হাছান মাহমুদ শুক্রবার বেনারকে বলেন, “আমাদের প্রধানমন্ত্রী খুব পরিষ্কারভাবেই জানিয়েছেন, বাংলাদেশ কখনো মিয়ানমারের সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর কোনোকিছু সমর্থন করে না।”
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি মিয়ানমারের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে এর আগে আনাদোলুর কাছেও মন্তব্য করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।
“রোহিঙ্গাদের আলাদা রাজ্য দেবার বিষয়টি বাংলাদেশ কোনোভাবেই সমর্থন করে না। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। বাংলাদেশ শুধু চায়, অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন,” বেনারকে বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা।
অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ: মিয়ানমার
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দাবি করে মাহাথির মোহাম্মদের দেওয়া বক্তব্যকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে মিয়ানমার।
শুক্রবার দেশটির রাজধানী নেপিদোর প্রেসিডেন্ট ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবাদ জানান মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জ থে।
তিনি বলেন, “মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা আসিয়ানের অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা ও আসিয়ান চার্টারের নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যহীন।”
জ থে বলেন, “মিয়ানমার ও আসিয়ান রাখাইন রাজ্যের অনেক বিষয় নিয়ে একসাথে কাজ করছে, কিন্তু তিনি (মাহাথির) যা বলেছেন তা আমাদের সহযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করেছে।”
মাহাথিরের মন্তব্য মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে চলমান রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মন্তব্য করে জ থে বলেন, “মিয়ানমার অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এ ধরনের সমালোচনা সমর্থন করে না।”
তবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছা মালয়েশিয়ার নেই বলে সাক্ষাৎকারে জানান মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলেন মালয়েশিয়া শুধু মিয়ানমারে সংগঠিত নৃশংসতা ও হত্যাযজ্ঞের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
এদিকে মাহাথিরের প্রস্তাবকে সমর্থন করে এ নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনার দাবি জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ হামিদ আলবার।
এক টুইট বার্তায় হামিদ আলবার বলেন, “মাহাথিরের দৃষ্টিভঙ্গি কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়। বরং মিয়ানমারই রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের মাধ্যমে অন্য দেশে তাড়িয়ে দিয়ে বিষয়টিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইসুতে পরিণত করেছে।”
প্রসঙ্গত, এর আগে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ।
এছাড়া গত মাসের শুরুর দিকে রাখাইন রাজ্যকে মিয়ানমার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাব করেন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান।
তবে এই প্রস্তাবকে ‘অন্যায়’ বলে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন “মিয়ানমার তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে।
রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নীপিড়নমূলক অভিযানের ফলে ২০১৭ সালের আগস্টের পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ শরণার্থী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাসহ কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বর্তমানে এগারো লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। মালয়েশিয়াতে রয়েছেন প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করলেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরে যাননি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: