বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগের এক বছর পার

ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি ঘোষণার পর থেকে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দাল, বিতর্কিতদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদায়ন, সঠিক সময়ে কর্মসূচিতে উপস্থিত না হওয়া, জেলা কমিটিকে উপেক্ষা করে উপজেলা কমিটি দেওয়া, মেয়াদ উত্তীর্ণ জেলা কমিটিগুলোর সম্মেলন না করা- এসব মিলিয়ে প্রতিনিয়ত ভ্রাতৃপ্রতীম এ সংগঠনকে নিয়ে বিব্রত কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ।
ছাত্রলীগ সূত্রে জানা যায়, গত পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও ঢাবি ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ে কনসার্টের আয়োজন করে। কনসার্টে জেমস, মিলা, ওয়ারফেজ, আর্টসেল ও ফিডব্যাকসহ বেশ কয়েকটি ব্যান্ড আসার কথা ছিল। এই কনসার্টকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের সমর্থক ও ডাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ও ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়। একাধিক বার কনসার্টস্থলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন শোভনের সমর্থকেরা।
যদিও পরে হামলাকারী অনেককে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ দেওয়া হয়। এঁদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান তুষার সহসভাপতি, প্রদীপ চৌধুরী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও আহসান হাবীব দপ্তর সম্পাদকের পদ পান।
বিতর্কিতদের নিয়ে কমিটি গঠন
গত বছরের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের প্রায় আড়াই মাস পর ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর শোভন-রাব্বানী চলতি বছরের ১৩ মে ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন। কমিটি ঘোষণার এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর ঢাবি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতারা। এর পর মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে দুইবার হামলার শিকার হন পদবঞ্চিতরা। এতে ছাত্রলীগের সাবেক উপ-অর্থ সম্পাদক ও ডাকসুর সদস্য তিলোত্তমা শিকদার, ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক তানভীর ভূঁইয়া শাকিল, ডাকসুর সদস্য ও কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রলীগের সভাপতি ফরিদা পারভীন ও সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী শায়লা, ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক, রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সভাপতি বি এম লিপি আক্তার আহত হন। এ সময় চেয়ারের আঘাতে রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী দিশার মাথা ফেটে যায়।
বিতর্কিত কমিটি ও হামলার বিষয়ে প্রতিবাদ করলে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জারিন দিয়াকে বহিষ্কার করেন শোভন-রাব্বানী। পরে তাঁদের দুজনের প্রতি কিছু প্রশ্ন রেখে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন দিয়া।
বিতর্কিত নেতা যারা
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ২ নম্বর সহসভাপতি তানজিল ভূঁইয়া তানভীর ও ২০ নম্বর সহসভাপতি মো. তৌহিদুর রহমান হিমেল প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদারী ব্যবসায়ী। ৫ নম্বর সহসভাপতি আরেফিন সিদ্দিকী সুজন ও ৬ নম্বর সহসভাপতি আতিকুর রহমান খানের বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবন ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আরেক সহসভাপতি মাহমুদুল হাসান তুষারের পরিবার জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সহসভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল গোপালগঞ্জে একটি হত্যা মামলার আসামি।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. রাকিনুল হক চৌধুরী কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের আপন ছোট ভাই। তিনি ছাত্রলীগে নিষ্ক্রিয় বলে জানা গেছে।
এছাড়া কেন্দ্রীয় সহসভাপতি পদ পাওয়া সোহানী হাসান তিথি, সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপ-সম্পাদক পদ আফরিন লাবণী ও সহসম্পাদক সামিহা সরকার সুইটি বিবাহিত।
পরে পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, বর্তমান কমিটিতে ৯৯ জন বিতর্কিত রয়েছে যারা কোনোভাবে ছাত্রলীগের সদস্য হতে পারেন না।
পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ১৫ জন বিতর্কিতের নাম প্রকাশ করেন। এ কমিটির পর একাধিকবার আন্দোলনে যান পদবঞ্চিতরা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আশ্বাসের পরও এখন পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হয়নি।
সম্মেলনে কর্মীর মৃত্যু
গত ২০ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে শাখা ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে অসুস্থ হয়ে সুলতান মো. ওয়াসি নামের এক কর্মী মারা যান। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে দায়ী করেছেন সাধারণ নেতাকর্মীরা। বেলা ১১টায় সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সম্মেলন শুরু হয় বিকেল ৩টায়। সম্মেলন বিলম্বে শুরু করার কারণ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন উপস্থিত হন দুপুর ২টা ২০ মিনিটে আর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী উপস্থিত হন ২টা ৩০ মিনিটে। ওই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন দুপুর ১২টায়।
এতটা সময় ধরে পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে অবস্থান নেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। প্রচণ্ড গরমে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর মধ্যে সুলতান মো. ওয়াসি মারা যান। আর জবির ১৩ ব্যাচের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী রাফিত এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে আসা সহসভাপতি হিমু অসুস্থ হয়ে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন।
সাংগঠনিক জেলা কমিটি
গত এক বছরে নতুন করে একটিও সাংগঠনিক জেলা কমিটি করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। তবে বেশ কয়েকটি জেলা ও মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছে। ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক মো. আহসান হাবিব এনটিভি অনলাইনকে বলেন, আমরা মাত্র দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়, আর কয়েকটি উপজেলা কমিটি দিয়েছি। তবে কোনো জেলা সম্মেলন বা কমিটি এখনো দিতে পারিনি।
এসব বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে একাধিকবার কল দিলেও তারা ফোন ধরেননি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: