শম্ভু পুত্র সুনাম বরগুনার ‘বদি’

কক্সবাজারের পর এবার মাদকের নতুন রুট বা ঘাঁটি হিসেবে তৈরী হয়েছে বরগুনা। দেশের মাদক তথা ইয়াবা চোরাচালান বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে সাগর পাড়ের এই জেলাটি। বলা চলে, মাদকে সয়লাব বরগুনা শহর। আর এই মাদক ব্যবসা করে অনেকেই রাতারাতি গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে গেছেন।
এই মাদক ‘বাণিজ্যের’ সঙ্গেও জড়িয়ে আছে বরগুনা সদর আসনের এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথের নাম। যুগান্তর’র এক বিশেষ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
তবে, জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক সুনাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার এমপি পিতার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়েই একটি মহল এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
সেখানকার মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে বোঝার জন্য ২০১৫ সালের একটি ঘটনাই যথেষ্ট। বরগুনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ আহম্মেদ হঠাৎ একদিন স্কুল চলার সময় বন্ধ করে দিলেন প্রধান গেট। সীমানা দেয়াল ঘেরা স্কুলের মহিলা শিক্ষকরা ছাত্রীদের দেহ তল্লাশি করে ১৪ জনের কাছ থেকে উদ্ধার করেন ইয়াবা-গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদক দ্রব্য। ওই ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
ওই স্কুলের একাধিক শিক্ষকের বলেন, ‘বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তখন আমরা বাড়াবাড়ি করিনি। তবে ছাত্রীদের সাবধান করার পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদেরও জানিয়েছি।’
স্থানীয় সংবাদকর্মী ও আইনজীবী সোহেল হাফিজ বলেন, ‘শান্ত বরগুনার ভেতরটা দারুণভাবে ক্ষয়ে গেছে মাদকের ভয়াবহতায়। তরুণদের বড় অংশই এখন মাদকসেবী। চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যার নেপথ্যেও মাদকের অভিযোগ। ওই মামলার ১২ আসামির মধ্যে ৭ জনের বিরুদ্ধেই মাদকের অভিযোগ।’
জানা গেছে, নিহত রিফাত একবার মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছিল। বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ডও ছিল কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী। দ্রুত অর্থ উপার্জনের সহজ উপায় হয়ে ওঠা মাদকের বলি হচ্ছে দেশের কিশোর-কিশোরীরা।
এ বিষয়ে বরগুনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি চিত্তরঞ্জন বলেন, ‘তাকালেই দেখা যায় মাদকের ভয়াবহতা। রিফাত হত্যার পর পুলিশের তৎপরতা এবং প্রবেশ পথে চেকপোস্ট বসানোয় সম্প্রতি মাদকের ভয়াবহতা কিছুটা কমলেও গত ১০-১১ বছরে যে ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে।’
দেশে ইয়াবার বড় বড় চালান গুলো ঢুকছিলো নাফ নদী দিয়ে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণে বিকল্প রুট হিসেবে বেছে নেয়া হয় বরগুনাকে। জেলা শহরের কাছেই সাগরপাড়ের দুই উপজেলা তালতলী ও পাথরঘাটা।
তালতলীর সমুদ্র সৈকত শুভসন্ধ্যা সংলগ্ন অগভীর সমুদ্রে দ্বীপচর, টেংরাগীরি সৈকত এবং পাথরঘাটার বলেশ্বর মোহনা হয়ে ঢুকছে এসব ইয়াবার চালান। আর যারা এই পথ ব্যবহার করে ইয়াবা নিয়ে আসছে তাদের নামও সবার মুখে মুখে। তেমনি এক নাম তালতলীর মালেক কোম্পানি।
উপজেলার নির্বাচিত এক জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘পথের লোক থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক এই মালেক এখন আওয়ামী লীগ নেতা। বাড়ি-গাড়ির পাশাপাশি লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্রও আছে তার। মাছের কারবারি হলেও মালেকের আয়ের প্রধান উৎস সবার জানা।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মালেক কোম্পানিকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও ফোনটি রিসিভ হয়নি বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পাথরঘাটায় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল। তাকে পাথরঘাটার মুকুটবিহীন সম্রাটও বলা হয় থাকে। পৌরশহরে তার অফিসে ঢুকতে হলে একাধিক গেট পেরুতে হয়, রয়েছে সিসি ক্যামেরাও। এমনকি তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও মাদকের মামলা রয়েছে।
পাথরঘাটার একাধিক জেলের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কক্সবাজারের কিছু রহস্যজনক ট্রলার প্রায়ই আসে বরগুনা উপকূলে। নদীর মোহনা সংলগ্ন এলাকায় এসব ট্রলারের কাছে ভেড়ে স্থানীয় ট্রলার। মাছের এসব ট্রলারেই আসা ইয়াবার চালানের কিছু অংশ বরগুনায় বাকিটা যায় সড়ক ও নৌপথে সারা দেশে।’
চলতি বছরের এপ্রিলে বরগুনা-ঢাকা রুটের লঞ্চ এমভি সপ্তবর্ণা-১ থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৮ লাখ ইয়াবাসহ তুহিন, সবুজ এবং শাহজাহান নামে তিনজনকে আটক করে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে তারা কিছুদিন পরপরই এভাবে ইয়াবার বড় বড় চালান বরগুনা থেকে ঢাকায় পাঠানোর কথা স্বীকার করে।
এ বিষয়ে পৌর কাউন্সিলর সোহেল বলেন, ‘এসবই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ। এগুলো অপপ্রচার।’
জেলা শহরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে এমপিপুত্র সুনাম দেবনাথের নাম শোনা যায়। অনেক মাদক কারবারির সঙ্গেই সুনামের ওঠা-বসার চিত্র আছে। এমনকি চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যার মূল আসামি বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ডও ছিল সুনামের লোক। সুনামের চাচাতো শ্যালক অভিজিত তালুকদারের সঙ্গেও নয়নের যাতায়াত ছিল সুনামের অফিস-বাসায়।
২০১৭ সালের শেষদিকে বিপুল মাদকসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় নয়ন। ওই একই রাতে পুলিশ অভিযান চালায় কলেজ রোডে সুনাম দেবনাথের প্রতিষ্ঠান সুনাম দেবনাথ ব্লাড ফাউন্ডেশনের অফিসে। পুলিশ যখন ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছিল তখন পেছন দিয়ে পালিয়ে যায় দুই-তিনজন।
তখন এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, ‘ওই অফিসে যদি অপরাধ কর্মকাণ্ড নাই-ই ঘটবে তাহলে কেনো তাদের পালিয়ে যেতে হল?’ এরপর বন্ধ হয়ে যায় সুনাম ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘রিফাত হত্যার পর সুনামই গণমাধ্যমে বলেছেন, রিফাত তাদের কর্মী ছিল। রিফাতকে অনেক ভালোবাসতাম।’ কিন্তু এই রিফাতও মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলো।
রিফাত হত্যার পর আলোচনায় আসে নয়ন বন্ডের ‘০০৭ গ্রুপ’ ও ‘টিম সিক্সটি’ নামের দুটি গ্রুপ। টিম সিক্সটির প্রধান হচ্ছে মঞ্জুরুল আলম জন। তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে মাদকের পাইকারি বাণিজ্যের।
জনের বাবা রইসুল আলম রিপন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এই নয়ন ও জনের সঙ্গে সুনামের অনেক ঘনিষ্ঠ ছবি রয়েছে। এভাবে দুয়ে-দুয়ে চার মেলালেও মেলে মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে সুনামের যোগসাজশ।
সুনামের চাচাতো শ্যালক শাওন তালুকদারের বিরুদ্ধেও মাদক নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে । তবে কোনো মামলা না থাকায় শাওনকে ক্লিন ইমেজের মাদক ব্যবসায়ীও বলেন অনেকে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ছাড়া শাওনের আয়ের উৎস সম্পর্কে আর কেউ কিছু জানা না। কিন্তু তিনি অনেক বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। শাওনই নাকি সুনামের হয়ে মাদকের ব্যবসা দেখভাল করেন বলে কথা শোনা যায়।
তবে মাদকের মামলা আছে শাওনের চাচাতো ভাই অভি এবং ফুফাতো ভাই তুষারের নামে। তুষার জেলও খেটেছে। বরগুনায় লোক মুখে একটি কথা চালু আছে, ‘শাওনের শরীরে কাদা লাগতে দেননি সুনামই।’
বরগুনার মাদক রাজত্বে আরেক নাম ও সুনামের আপন খালু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমানের ভাইয়ের ছেলে সুমন। ইয়াবা নিয়ে ধরা পড়ে জেলও খেটেছেন। সুনামের আরেক ঘনিষ্ঠ অভিজিৎ তালুকদারের বিরুদ্ধেও রয়েছে মাদকের একাধিক মামলা।
জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আদনান হোসেন অনিক বলেন, ‘সুনামের মাদক বাণিজ্যের বিরুদ্ধে গত বছর সংবাদ সম্মেলন করেছি আমরা কিন্তু তারপরও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘জেলা পর্যায়ের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থাকা মানুষটি যখন অপরাধে যুক্ত হয় তখন পুলিশের চুপ করে দেখা ছাড়া আর কিছুই করা থাকে না।’
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে সুনাম দেবনাথ বলেন, ‘রাজনীতি করি, বহু মানুষের সঙ্গেই ছবি আছে। তার মানে কি এই যে, তারা চোর হলে আমিও চোর? খবরের কাগজগুলোতে আমার সম্পর্কে যেসব লেখা হচ্ছে তা দেখছি প্রতিদিন। আমার বিষয়ে লেখা হচ্ছে- জানা গেছে, শোনা গেছে, একটি সূত্র বলেছে এসব। আরে ভাই সূত্রটা কে, তা লিখুন। সাংবাদিকতা তো এখন অনেকদূর এগিয়েছে। তাহলে জানা গেছে, শোনা গেছে কেন?’
সুনাম আরো বলেন, ‘আমার কোনো ভবনে পুলিশি তল্লাশি হয়নি। অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ লিখুন। সঠিক প্রমাণ দিতে পারলে আমি নিজেই পুলিশের কাছে ধরা দেব। সবাই জানে যে আমার বাবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আছে। তারা আমাদের রাজনীতি ধ্বংস করতে চায়। তারাই এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বারবার বলা হচ্ছে কতিপয় ছাত্রলীগ নেতার সংবাদ সম্মেলনের কথা। ওই সম্মেলনেও কি এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কেউ দিতে পেরেছে যে, আমি মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত? সংবাদপত্রের মতো একটি মহান প্রতিষ্ঠান সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই সংবাদ প্রকাশ করবে বলে আমি আশা করি।’
এ বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হাসান বলেন, ‘যেভাবে মাদকের বিস্তারের কথা বলা হচ্ছে পরিস্থিতি আসলে ততটা ভয়াবহ নয়। তাছাড়া আমরাও প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছি। ২০১৮ সালে ৬৯৪টি মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়েছে ৮২৫ জন। ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে ১১ হাজারের বেশি। মাদক প্রতিরোধে প্রতিনিয়তই কাজ করছি আমরা। আর এক্ষেত্রে কোনো মহলের তদবির বা পুলিশের ওপর প্রভাব বিস্তারেরও কোনো ঘটনা নেই।’

Leave a Reply

%d bloggers like this: