আমদানিকারক সিন্ডিকেটের কারণেই বাড়ছে পেঁয়াজের ঝাঁজ!

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

দেশে পেঁয়াজের ব্যাপক মজুদ থাকা সত্ত্বেও বাজারে হঠাৎ অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে আমাদানিকারকদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করছে আড়তদাররা। মূলত তাদের চাপেই বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে কমিশনভিত্তিক (কেজিতে ৮০ পয়সা) এসব আড়তদারদের।
২৯ সেপ্টেম্বর (রোববার) ভারত সরকার বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানোর পর পর দেশের বাজারে মুহুর্তেই বেড়ে যায় দাম। অথচ আমাদানিকারকরা সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকেই অনেক কম মূল্যে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের সাথে এলসিতে চুক্তিবদ্ধ হয়ে যান। তাই চুক্তির দামে রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তের পরও এলসি খোলা রেখে অনেক পেঁয়াজ দেশে আমদানি হয়।
এর আগে বাজার সহনীয় রাখতে গত ৫ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার থেকে দেশে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করে সরকার। এছাড়া চীন, তুরষ্ক ও মিশর থেকেও পেঁয়াজ আমাদানি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাই বর্তমানে ভারতের পাশাপাশি অন্যান্য দেশেরও পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। কিন্তু তারপরও আমাদানিকারকদের কিছু সিন্ডিকেট অতিরিক্ত লাভের আশায় ভারতের রপ্তানি বন্ধের সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
আড়ত ব্যবসায়ীদের একাধিক সূত্রে থেকে জানা যায়, স্থলবন্দরগুলোতে একই ব্যক্তি রপ্তানিকারক একইসাথে আমদানিকারকের ভূমিকায় রয়েছেন। প্রান্ত বদল করে তারা হয়ে যান রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক। এদের মধ্যে ভারতীয়দের পাশাপাশি বাংলাদেশেরও অনেকজন রয়েছেন। তারা দুই প্রান্তেই আলাদা আলাদা অফিস গড়ে তুলেছেন। মূলত তাদের হাতেই পেঁয়াজের দর নির্ধারণ করার ক্ষমতা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই প্রান্তে যখন একই ব্যক্তি আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক হন, সেক্ষেত্রে তারা চাইলেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আবার অস্থিতিশীলও করতে পারেন। মূলত অতিরিক্ত মুনাফালোভী কিছু অসাধু ইস্যু বানিয়ে বাজারগুলো অস্থিতিশীল করে তুলছে। তাই এবারও তারা ভারতের রপ্তানি বন্ধের সুযোগটিকে কাজে লাগাচ্ছে।
এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজের প্রতি টন ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করে দেয়। যেখানে আগে প্রতিটনের রপ্তানিমূল্য ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলার। তাই দাম বাড়ালেও বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক ও দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ভারত সরকারের বেঁধে দেওয়া বাড়তি দামেই পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত রাখে বাংলাদেশের আমদানিকারকরা। সেজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পেঁয়াজের এলসিও খোলা হয়। ফলে ঢাকাসহ সারাদেশে পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছিল। তখন ঢাকায় ৭০ টাকায় বিক্রি হওয়া ভারতীয় পেঁয়াজ কমে ৫৫ টাকায় নেমে আসে। সাথে হিলি স্থলবন্দরে তা আরও কমে ৪৭ টাকা থেকে ৫০ টাকায় আসে। কিন্তু হঠাৎ ভারত রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানোর সাথে সাথেই পেঁয়াজের মূল্য লাফাতে শুরু করেছে।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশনের (টিসিবি) হিসাব মতে, গত এক মাসে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত।
সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল পর্যন্ত দেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে ভারতসহ মিয়ানমারের পেঁয়াজে পাইকারিতে ৩২ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যথাক্রমে ৮৫-৯০ ও ৮০ টাকায় দাঁড়ায়। যেটি দিনশেষে আরও বেড়ে হাঁকিয়ে ফেলে সেঞ্চুরি। বিক্রি হয় প্রকারভেদে ৮০-১০০ টাকায়। যার প্রভাব চট্টগ্রামের বিভিন্ন খুচরা বাজারেও দেখা মেলে। বিভিন্ন সুপারশপে ১১০ টাকা, কোথাও ৯০ টাকা থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।
জানা যায়, চাহিদার ৬০-৭০ শতাংশ পেঁয়াজ দেশেই উৎপাদন হচ্ছে। বাকিগুলো আমদানি করতে হয়। আমদানির বেশির ভাগই ভারত নির্ভর। গত মৌসুমে দেশে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। এছাড়া আমদানি করা হয় ১০ লাখ ৯২ হাজার টন। তবে মৌসুমের শেষ সময় বৃষ্টির প্রকোপে বেশ কিছু পেঁয়াজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায়।
এদিকে সোমবার কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মিয়ানমার, মিসর, চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে ১ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। মিয়ানমারের আকিয়াব থেকে আটটি পেঁয়াজবোঝাই ট্রলার সোমবার দুপুরে নাফ নদীর টেকনাফ স্থলবন্দরে আসে। এখনও সমুদ্রে আমদানির পথে রয়েছে আরও দুই হাজার টন পেঁয়াজ।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে মিসর, চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে তিনটি কনটেইনারবাহী জাহাজে করে মোট ১৪টি কনটেইনার ভর্তি পেঁয়াজ এসেছে। আমদানিকারক জেনি এন্টারপ্রাইজ, এন এস ইন্টারন্যাশনাল ও হাফিজ কর্পোরেশন এমভি কালা পাগুরো, জাকার্তা ব্রিজ ও কোটা ওয়াজার জাহাজে করে এসব পেঁয়াজ আমদানি করেছে। ইতোমধ্যে জাহাজ থেকে পেঁয়াজ খালাস করা হচ্ছে। পরে শুল্কায়ন করে আরও এক-দুইদিন পর ছাড় দেয়া হবে।
এদিকে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিতিশীল অবস্থা কমাতে মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) সকাল ১১টা থেকে নগরীর খাতুনগঞ্জ ও রেয়াজুদ্দিন বাজারসহ তিনটি বাজারে অভিযান চালিয়েছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
খাতুনগঞ্জে অভিযান চলাকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, পেঁয়াজের দাম গত ২৬-২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোটামুটি সহনীয় থাকলেও গতকাল (সোমবার) থেকে অসহনীয় হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন আড়তে পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, আড়তদাররা আমাদের জানিয়েছে, বেশিরভাগ পেঁয়াজ অন্য জেলা থেকে আসে। নিপা এন্টারপ্রাইজ, টাটা ট্রেডার্সসহ সাতক্ষীরার একটি আমদানি প্রতিষ্ঠান তাদের বেশি দামে বিক্রি করতে চাপ প্রয়োগ করছে। এ বিষয়ে আমরা আমাদের উপরের মহলকে অবহিত করে ব্যবস্থা নিতে বলবো।
তিনি আরও বলেন, আমরা ইতোমধ্যে অভিযান থেকে তাদেরকে সহনীয় মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি করতে সতর্ক করে দিয়েছি। আড়ত ব্যবসায়ী নেতারাও আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছেন। অভিযানের সাথে সাথে বর্তমানে পেঁয়াজের দাম ২০-২৫ টাকা পর্যন্ত ক্ষেত্রবেধে কমে গেছে।
আমদানিকারকদের চাপের কথা স্বীকার করে খাতুনগঞ্জ হামিদুল্লাহ মার্কেট কাঁচা পণ্যের আড়তদার জাবেদ ইকবাল সিভয়েসকে বলেন, আমদানিকারদের নানামূখি চাপে আমাদেরকে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরা তাই তাদের কথার বাইরে যেতে পারছিনা। ভারতে যিনি রপ্তানিকারক এদেশে তিনি আবার আমদানিকারকও। তাই সমস্যাগুলো হচ্ছে।
তিনি বলেন, দাম বাড়লেও আজ কোনো খরিদ্দার নেই। সর্বত্র যেন আতঙ্ক বিরাজ করছে।
তবে অভিযানে হুমকি-ধমকিসহ একটি আড়তকে জরিমানা করা হয়েছে দাবি করে হামিদুল্লাহ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস সিভয়েসকে বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে আমরা কমিশনে পেঁয়াজ বিক্রি করি। তাই তাদের উপরই আমাদের নির্ভর করতে হয়। জেলা প্রশাসন থেকে আজ বিকেলে আমাদের সাথে বসার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই অভিযান চালিয়ে আমাদেরকে হুমকি-ধমকি দিয়ে গেছে ম্যাজিস্ট্রেট।
তিনি বলেন, ম্যাজিস্ট্রেট আমাদেরকে ৫৫-৬০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করতে বলেছে। কিন্তু বাড়তি দামে কেনায়, আমাদের সেই পরিস্থিতি নেই। এমন অবস্থায় ব্যবসা ছেড়ে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় দেখছিনা।
গতকাল দাম কমে গেছে জানিয়ে মোহাম্মদ ইদ্রিস আরও জানান, পেঁয়াজের দাম আজ কমে এসেছে। বর্তমানে ভারতীয়গুলো ৮৫ টাকা আর মিয়ানমারেরগুলো ৭০-৭৫ টাকায় নেমে এসেছে। তবে বাজারে কোনো ক্রেতা নেই বলেও জানান এ ব্যবসায়ী।

Leave a Reply

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

%d bloggers like this: