বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্ক; অস্বস্তি এবং সংশয়

হঠাৎ করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নানা অস্বস্তি এবং সংশয় প্রকাশ পাচ্ছে। কিছুদিন আগেও দুইদেশের শীর্ষনেতারা বলেছিলেন যে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন সবচেয়ে সুখকর সময় কাটাচ্ছে এবং দুইদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে কিছু ঘটনা প্রবাহ ইঙ্গিত করছে যে সেই সম্পর্ক এখন আগের জায়গায় নেই। সম্পর্কে কিছু টানাপোড়েনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। যদিও ভারত এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে যে সম্পর্কে কোনো টানাপোড়েন নেই। টুকটাক সমস্যা রয়েছে, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
কিন্তু কূটনৈতিক সূত্রে বলা হচ্ছে যে, কয়েকটি ঘটনায় বাংলাদেশ এবং ভারতের সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি এবং সংশয় দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-

দিল্লী সফর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত অক্টোবরে দিল্লী সফর করেন। নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাগ্রহণের পর এটি ছিল শেখ হাসিনার প্রথম দিল্লী সফর। এই সফরকে ঘিরে দুইদেশেরই আগ্রহ ছিল অনেক। কিন্তু এই সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ গুরুত্ব এবং মর্যাদা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, এর আগে প্রথম মেয়াদে নরেন্দ্র মোদি যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন যেমন শেখ হাসিনা দিল্লীতে গেলে সমস্ত প্রটোকল ভঙ্গ করে মোদি শেখ হাসিনাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন, এবার সেরকম কিছুই ঘটেনি। এবার পুরো সফরের মধ্যে কোথায় যেন আন্তরিকতার অভাব ছিল। যেমন, দুইদেশের মধ্যে যে চুক্তিগুলো হয়েছে, সেই চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারকগুলো নিয়ে অনেকে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

কলকাতা সফর

সৌরভ গাঙ্গুলী ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হওয়ার পর ইডেনে ভারত বাংলাদেশ দিবা-রাত্রির টেস্টের উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রন জানান। প্রধানমন্ত্রী সেই আমন্ত্রনে সাড়া দেন। ২২ নভেম্বর সকালে তিনি ঝটিকা সফরে কলকাতা যান। কিন্তু কলকাতায় যেভাবে তাকে প্রটোকল দেওয়া হয়েছে বা তার সাথে আচারণ করা হয়েছে তা নিয়ে ক্ষুদ্ধ ভারতের গণমাধ্যমই। আনন্দবাজার, টাইমস অব ইন্ডিয়া সবাই এখানে প্রধানমন্ত্রীকে যথাযত মর্যাদা দেওয়া হয়নি বলে সমালোচনা করেছেন। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন কলকাতায় গেলেন তখন কেন্দ্রীয় সরকারের কেউ তাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাবে না এটা নজীরবিহীন বলেও ভারতীয় গণমাধ্যম বলেছে। কলকাতার পুরো সফরটিতে আওয়ামী সভাপতি শেখ হাসিনাকে যথাযত সম্মান মর্যাদা দেওয়া হয়নি বলেও অনেকে মনে করছেন।

একজন কুটনৈতিক বলেছেন, শেখ হাসিনা শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নন তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। বঙ্গবন্ধু এই উপমহাদেশের সর্বকালের সেরা নেতাদের অন্যতম। তার কন্যাকে এভাবে মর্যাদাহীন ভাবে বরণ ভারতের জন্যই বেদনাদায়ক এবং লজ্জাকর। কি কারণে এমনটা করা হয়েছে তা নিয়ে ভারতীয় পত্র পত্রিকায় নানা রকম বিশ্লেষণ দেওয়া হচ্ছে।

পেঁয়াজ সংকট

বাংলাদেশে যখন পেঁয়াজ সংকট শুরু হলো সেই সংকটের মূল কারণ ছিল ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করা। এই ঘোষণার পরই বাংলাদেশে লাফিয়ে লাফিয়ে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। যদিও অক্টোবরের দিল্লী সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেঁয়াজ কুটনীতিতে অংশ নিয়েছিলেন। সে সময় তিনি অনুযোগ করে বলেছিলেন, এভাবে হুট করে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশ কিছুটা সমস্যায় পড়েছে। কিন্তু এরপর ভারতের মন গলেনি। ভারত এখন পর্যন্ত তাদের রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। ভারত এখন পর্যন্ত তাদের রপ্তানি চালু করেনি। ফলে পেঁয়াজের দাম এখন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। অনেক কূটনৈতিক মনে করেন যে, পেঁয়াজ সংকটটা ভারত ইচ্ছে করেই সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ওপর একটি চাপ প্রয়োগের জন্য। কিন্তু কেন বাংলাদেশের ওপর কেন হঠাৎ করে চাপ প্রয়োগের অভিপ্রায় ভারতের হলো সে বিষয়টি এখনো অজানা।

পুশ ইন

হঠাৎ করেই আসাম এবং পশ্চিম বাংলার নাগরিকপঞ্জী হয়েছে। বেশ কয়েকজন বাঙালিকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটেছে যখন প্রধানমন্ত্রী তার কয়েকদিন আগে কলকাতা সফর করে এসেছেন। এই সময়ে হঠাৎ করে পুশ ইন কেন তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন। যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুশ ইনের ব্যাপারে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানে না। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারীভাবে কিছু জানুক আর নাইবা জানুক পুশ ইনের ঘটনায় পুরো বাংলাদেশে একটা অস্থিরতা এবং সংশয় তৈরী করেছে। কিছুদিন আগে আসামের নাগরিকপঞ্জীর সময় থেকেই যে অস্বস্তি শুরু হয়েছিল তা এখন উদ্বেগের পর্যায়ে চলে গেছে।

ভারতজুড়ে নাগরিকপঞ্জী

ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতারা কেউ কেউ স্পষ্ট বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থান নিয়েছেনে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলেছেন। কোন কোন বিজেপির নেতারা বলেছেন যে, সারা ভারতেই নাগরিকপঞ্জী হবে এবং যত বাংলাদেশ থেকে আগত আছে তাদের ভারত থেকে বাংলাদেশে বিতাড়িত করে দেওয়া হবে। এরকম দায়িত্বহীন মন্তব্যের পরও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
কাজেই কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে যে, বাংলাদেশ ভারত যে সম্পর্ক যে উচ্চতায় উঠেছিল তা এখন আর নেই। তা এখন নামতে শুরু করেছে। কিন্তু কেন নামছে সে ব্যাপারে কোন সদুত্তর নেই।

বাংলা ইনসাইডার

Leave a Reply

%d bloggers like this: