বাংলাদেশের ওপর ভারতের চাপ কেন?

বুধবার ভারতের মন্ত্রিসভায় বিতর্কিত নাগরিকত্ব বিল পাশ হয়েছে। এ্ই নাগরিকত্ব বিলের ফলে ভারতে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক মুসলমানের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়লো। এর প্রথম শিকার হতে পারে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক মহল মনে করছেন, বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যই এরকম করা হচ্ছে। নাগরিকত্ব বিল পাশের আগের থেকেই বাংলাদেশ- ভারত সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভারতের পক্ষে থেকেই উসকানো হচ্ছে বলে সীমান্ত থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যে জানা গেছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক যে উঁচুতে উঠেছিল সেখান থেকে আচমকাই সেই সম্পর্ক নিয়ে রহস্য এবং অস্বস্তি তৈরী হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে ভারত কি চায়? ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্ক আস্তে আস্তে উন্নতির দিকে যাচ্ছিল। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর এই সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। এমনকি ভারতের কংগ্রেস সরকার হেরে যাওয়ার পর বিজেপি দায়িত্বে এলেও এই সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটেনি বরং সম্পর্কের উঞ্চতা আরো বাড়ে। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে নরেন্দ্র মোদি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কেন এটা হচ্ছে তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে নানামুখী বক্তব্য পাওয়া যায়।
বাংলা ইনসাইডার বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে কথা বলে এর পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পেয়েছে…
১. নরেন্দ্র মোদীর উগ্র হিন্দুত্ববাদী নীতি:
বাংলাদেশ একটি সেক্যুলার উদারতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং আওয়ামীলীগ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল। যেমনটি ভারতের কংগ্রেস। কিন্তু বিজিপি হল মৌলবাদী ঘরানার হিন্দুত্ববাদকে লালন করা একটি দল এবং দ্বিতীয় মেয়াদে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর হিন্দুত্ববাদকে আরো উসকে দেয়া হচ্ছে। সেখানে ভারতেই হিন্দুত্ববাদের জাগরণ নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে এবং মুক্তচিত্তের মানুষরা আতঙ্ক বোধ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, যেকোন উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রই তাঁর প্রতিবেশী দেশের জন্য বিপদজনক। সেজন্য ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে স্বাভাবিক ছন্দ, সেই ছন্দে বিঘ্ন ঘটছে।
২. বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক:
অনেক কূটনৈতিক মনে করছে চীন থেকে বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনা এবং চীনের সঙ্গে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভারত ভালোভাবে দেখছে না। সেজন্য বাংলাদেশকে চাপে রাখার একটা কৌশল হিসেবে ভারত নাগরিকত্ব বিলসহ নানা ইস্যু উত্থাপন করছে।
৩. বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অভিযোগ:
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ভারতের কাছে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিপীড়ন, বিশেষ করে নানা রকম গালভরা অযৌক্তিক অভিযোগ করে আসেছে। এই অভিযোগগুলো আগে আমলে নেওয়া না হলেও এখন কট্টর হিন্দুত্ববাদী সরকার ভারতে থাকার কারণে এই অভিযোগগুলোকে আমলে নেওয়া হচ্ছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নরেন্দ্র মোদীর কাছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পিয়া সাহাও সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠন বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে এবং গোপনে ভারতের কাছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিপীড়নের নালিশ করেছে। যদিও এই সব অভিযোগের সত্যতা নেই বললেই চলে। তারপরেও যেহেতু একটি উগ্র মতবাদে বিশ্বাসীর দল এখন ভারতে ক্ষমতায় সেজন্য এই অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য এ ধরণের কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে বলে অনেক মনে করেন।
৪. বাংলাদেশের উন্নয়ন:
এবার ভারতের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার হয়েছে ৪.৫। যা ভারতের গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হারের যে উর্ধগতি সেটা অব্যাহত রেখেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশ ঈশ্বনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। পেশাক শিল্পে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ভালো ফলাফল করছে। পাশের একটি রাষ্ট্রের এমন সাফল্যে ভারত ঈশ্বনীয়। সেজন্য বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এটা করা হতে পারে বলে অনেকে মনে করছে।
৫. শেখ হাসিনার বিশ্ব নেতা হিসেবে আবির্ভাব:
এই উপমহাদেশে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শেখ হাসিনাই দলের প্রধাণ নেতা। যার বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা এবং মানবিক আবেদন অনেক বেশি। বিশেষ করে ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় দেওয়ার কারণে শেখ হাসিনা এখন বিশ্বের শ্রেষ্ট নেতাদের কাতারে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি কট্টর মৌলবাদী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কাজেই সবসময় ভারত বাংলাদেশের ছোট রাষ্ট্রের বড় নেতা এবং দেশে বিদেশে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা ভারতের একটি মহলের কাছে পছন্দ হচ্ছে না। এ কারণেই বাংলাদেশ সরকারকে দুর্বল করা বা বাংলাদেশকে অস্বস্তিতে ফেলার একটি কৌশল ভারত নিয়েছে বলে অনেক কূটনৈতিকরা মনে করছেন।
তবে রাজনৈতিক মহল মনে করে, ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক যে উষ্ণতায় ছিল সেখান থেকে যদি শীতল হয় তাহলে ক্ষতি হবে দুই দেশেরই।
উৎসঃ বাংলা ইনসাইডার

Leave a Reply

%d bloggers like this: