রাজাকারের তালিকা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

রাজাকারের তালিকা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে। মুক্তিযোদ্ধা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীসহ বেশ কিছু নাম আসায় প্রকাশের দিন থেকেই বিতর্ক শুরু হয়েছে চার দিকে। ক্ষুব্ধ, সংক্ষুব্ধ তালিকায় নাম আসা মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন, সংগঠকসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন এই তালিকা নিয়ে। তীব্র সমালোচনা হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনেও। রোববার প্রথম পর্বে মুক্তিযু্‌দ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১০৭৮৯ জন রাজাকারের নাম প্রকাশ করে। তালিকায় মুুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসায় গতকাল মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অভিযোগের পরিমান বেশি হলে তালিকা প্রত্যাহার করে নেয়ার চিন্তা করা হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর নাম তালিকায় আসায় ক্ষুব্ধ ট্রাইব্যুনালের অন্য প্রসিকিউটররা। গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে টিপু বলেন, তিনি ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। তালিকায় তার নাম আসায় তিনি বিস্মিত। এটি সংশোধন না হলে প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেয়ার কথাও জানান তিনি।
মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ: রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসায় দুঃখপ্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, সদ্য প্রকাশ হওয়া তালিকায় ভুল বেশি হলে তা প্রত্যাহার করা হবে। গতকাল বাংলাদেশ শিল্পকবলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, একাত্তরে প্রস্তুত করা তালিকাটিতে পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সংযোজন করে থাকতে পারে। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যে তালিকা পেয়েছি, হুবহু তা প্রকাশ করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সে সময়ের সরকারি রেকর্ড দিয়েছে, নতুন তালিকা করেনি। মোজাম্মেল হক বলেন, ১৯৭১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতকৃত রাজাকারদের তালিকা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে হুবহু প্রকাশ করা হয়েছে। এ তালিকা আগেই তৈরি করে রেখে গেছে। সেখানে কোনো ইল মোটিভ থাকতে পারে, উদ্দেশ্যমূলক হতে পারে। যেভাবে আছে, সেভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আমরা এটা এডিট করি নাই, দাঁড়ি-কমা, সেমিকোলন চেঞ্জ করি নাই। মন্ত্রী বলেন, আমরা অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলছি, এই তালিকা আমরা তৈরি করি নাই। জাতির দাবি ছিল, তাই প্রকাশ করেছি। আমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তৈরি করি নাই। এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইবেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দুঃখ প্রকাশ করা ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে তো কোনো পার্থক্য নাই। নিঃসন্দেহে এটা ক্ষমার চোখে দেখবেন। মোজাম্মেল হক বলেন, ভুলের দায় এড়াতে পারি না। যেসব অভিযোগ পাব, যাচাই করে সেসব নাম প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। ভবিষ্যতে তালিকা প্রকাশের আগে যাচাই-বাছাই করে পরে প্রকাশ করা হবে। বর্তমান তালিকায় ভুল-ভ্রান্তি বেশি থাকলে তা প্রত্যাহার করে নেয়া হবে।
রাজাকারের তালিকা প্রকাশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘নোট বিবেচিত হয়নি’: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাজাকারের তালিকা সরবরাহের সময় প্রত্যাহার হওয়া নাম-মামলার বিষয়ে ‘নোট’ দেয়া হলেও সেগুলো বিবেচনা না করেই প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ওই নোটগুলো বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী তালিকা প্রকাশ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে কৃষক লীগের এক আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে দালাল আইনে বিবাদীদের লিস্ট আমরা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আমরা উইথড্রগুলোর নোট দিয়েছিলাম। সেটা তালিকায় যাথাযথভাবে আসেনি। আশা করি, তারা যাথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে তা প্রকাশ করবে।
মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা: ওদিকে প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় ভুলভাবে কারও নাম এসে থাকলে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে বলে জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। গতকাল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো ‘রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, শান্তিকমিটি ও স্বাধীনতাবিরোধী তালিকার বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর ব্যাখ্যায় এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, গত ১৫ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, শান্তি কমিটি ও স্বাধীনতাবিরোধী ১০ হাজার ৭৮৯ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোনো তালিকা প্রণয়ন করা হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা থেকে যেভাবে পাওয়া গেছে, সেভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এ তালিকায় বেশ কিছু নাম এসেছে, যারা রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, শান্তি কমিটি বা স্বাধীনতাবিরোধী নন, বরং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের বা মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো ব্যক্তির নাম তালিকায় কিভাবে এসেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রকাশিত তালিকায় ভুলভাবে যদি কারও নাম এসে থাকে, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই অন্তে তার/তাদের নাম এ তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে। অনিচ্ছকৃত ভুলের জন্য মন্ত্রণালয়ের তরফে দুঃখ প্রকাশ করা হয় সিনিয়র তথ্য অফিসার সুফি আব্দুল্লাহিল মারুফ স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে।
তদন্ত দাবি বিশিষ্টজনদের: গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা, বেশ কয়েকজন সুপরিচিত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের নাম রাজাকারের তালিকায় আসায় বিস্মিত বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন, এর তদন্ত হওয়া উচিত। কেউ দায়ী হলে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, যারা এই তালিকা তৈরি করেছেন এটা তাদের অদক্ষতা ও অযোগ্যতার প্রমাণ। আজকাল বেশিরভাগ কাজে দলীয় পরিচয় অন্যতম প্রধান যোগ্যতা। এখানে আসল যোগ্যতা গৌন হয়ে গেছে। এ জন্য এসকল বিভ্রাট ঘটছে। আমরা নিজেরা কোনো তালিকা প্রস্তুত করিনি, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা যে তালিকা করেছে আমরা শুধু তা প্রকাশ করেছি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর এ বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটাও অদক্ষ এবং অযোগ্যতার আরেকটি বহিঃপ্রকাশ। এই তালিকাটি সম্পূর্ণ পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার উপর নির্ভর করে করা হয়েছে। ফলে এখানে বিভ্রাটতো ঘটবেই।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আট মাস জেল খেটেছেন। আজ তিনি রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা কেন এমন হল তার তদন্ত করা দরকার। এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তদন্ত করা উচিত। এরকম ভুল তথ্য দিয়ে জাতিকে কেন তারা বিভ্রান্ত করছে। এটা কিছুতেই গ্রহণ করা যায় না। একাত্তরের পরে কার কি ভুমিকা ছিল বাংলাদেশে। রাজাকার, আলবদর কারা ছিল তার তালিকা সঠিকভাবে তৈরি করা দরকার। এমনভাবে তৈরি করা উচিত হবে না যেটা ভুল হবে। এবং সমাজে একটি বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে।
শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এটা একটি হাস্যকর ব্যাপার। প্রকৃত রাজাকারদের বাঁচাতে এটি ইচ্ছাকৃত ভুল। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যেমন যত্ন নিয়ে করতে হবে একইভাবে রাজাকারদের তালিকাও যত্ন নিয়ে করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়ে যান তাহলে তার অন্তর্জ্বালা হবে না। কিন্তু রাজাকারের তালিকায় যদি মুক্তিযোদ্ধার নাম চলে যায় সেটা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকারে পরিণত করা অকল্পনীয় একটি বিষয়। ৪৮ বছর সময় নিয়েও সঠিক তালিকা তৈরি করা যায়নি। আমি মনে করি, ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্কিত করা হয়েছে যাতে তালিকাটি বাতিল হয়, সে রকম চেষ্টা সরকারের ভেতরে অনেকেই করছে। রাজাকারের তালিকা বিতর্কিত করে এটাকে আবার প্রত্যাহার করা হলে সেটি হিমাগারে চলে যাবে। কোনোদিন সেটা প্রস্তুত হবে না। এ বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারের ভেতরে কেউ ঘাপটি মেরে আছে যারা এই কাজটি করছে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী কি আগে থেকেই জানতেন এটা নিয়ে বিতর্ক হবে? তাই কি তিনি এখন প্রত্যাহারের কথা বলছেন। তারা জাতির সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলা করছে। মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করার এই দায়টা কে নেবে। তার মানে পাকিস্তান যা বলছে আপনারাও তাই মেনে নিয়েছেন। আপনাদের কোনো রাষ্ট্র নেই। এটা কি পাকিস্তান রাষ্ট্র। এটা তো স্বাধীন বাংলাদেশ। সরকারের উচিত তদন্ত করে বের করা কারা এই কাজটি করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, রাজাকারের তালিকা যদি সৎ উদ্দেশ্যে সঠিক পদ্ধতিতে প্রকাশ করা হয় তাহলে সেটা খুবই ভালো কাজ। কিন্তু এটা যেভাবে করা হয়েছে সেখানে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রকাশের সময়টা আমার কাছে একটু রহস্যজনক মনে হয়েছে। যাচাইবাছাই না করে এত তড়িঘড়ি করে এটা প্রকাশ করা হলো কেন। দ্বিতীয়ত, এটা যেহেতু খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু তাই এটা ক্ষমতাসীন দল তাদের দলের বাইরে থেকে তৈরি করবে কি না এটা নিয়ে প্রচুর সন্দেহ থাকার কারণ রয়েছে। এর আগে আমরা দেখেছি দেশের অনেক কুখ্যাত রাজাকার যারা ক্ষমতাসীন সরকারে আছে বা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়িত এমন কারো নাম দেখা যায়নি। আবার এমন অনেকের নাম এসেছে যারা মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে। এটা প্রমাণ করে ক্ষমতাসীনদের এই তালিকা করার মত সদিচ্ছা এবং সক্ষমতা আছে কি না সেটা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ রয়েছে।

Leave a Reply

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

%d bloggers like this: