এশিয়ান মানবপাচার নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দিতেন এমপি পাপুল

কুয়েতে আটক বাংলাদেশি সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল। এক সপ্তাহের রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠায় দেশটির আদালত। এক আদেশে বলা হয়, রিমান্ডে পাপুল কুয়েতে তার অপকর্মের সহযোগী সাবেক এবং বর্তমান যেসব কর্মকর্তার নাম বলেছেন তাদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখতে হবে।
এছাড়াও কাজী পাপুল ও তার মানবপাচার, অর্থপাচার ও ভিসা বাণিজ্যের অবৈধ কাজে সহায়তাকারী স্টাফ বা পার্টনার যারা ধরা পড়েছেন তাদের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটক রাখতে হবে। জিজ্ঞাসাবাদে এমপি পাপুলর দেয়া তথ্য কুয়েতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং প্রশাসনে অনেক চাঞ্চল্য অপেক্ষা করছে। এমন খবর প্রকাশ করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম আরব টাইমস।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্ত ওই এমপি তার কাজের সুবিধার জন্য কুয়েতি প্রশাসনের বড় কয়েকজন কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের ঘুষ ও উপহার দিয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন অবসরে চলে গেছেন।
আরো বলা হয়, ১১ জন বাংলাদেশি ভিকটিম যাদের প্রত্যেকে পাপুলকে ভিসা এবং কুয়েতে থাকার জন্য অর্থ দিয়েছেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একই সঙ্গে আটক তার কোম্পানির একজন পরিচালক যিনি কানাডার নাগরিক এবং একজন মিশরীয় স্টাফকেও পাপুলের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। এতে তদন্ত দল পাপুলের অবৈধ পথে বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ আহরণ এবং তা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রমাণ পায়। সমপ্রতি কয়েক মিলিয়ন দিনার ইউরোপীয় এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সরিয়ে নেয়ার দালিলিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আরো বলা হয়, পাপুলের এসব কাজে কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মধ্যস্থতার ভূমিকায় ছিলেন। মূলত পাপুলের অর্থ সরিয়ে নেয়ার কাজটি সহজ করে দিতে তিনি তার হাইলি পেইড এজেন্ট হিসেবে কনসালটেন্সি করছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতে এমপি পাপুল নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এছাড়াও মানবপাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে সব অপকর্মের দায় স্বীকার করেন তিনি।
এদিকে বাংলাদেশি এমপির নির্দেশে কাজ করায় ফেঁসে যাচ্ছেন কুয়েতিরা। পাপুলের কাছ থেকে ঘুষ, উপহার বা উপঢৌকন নিয়ে মানবপাচার, মানিলন্ডারিং এবং ভিসা বাণিজ্যে যারা সহযোগিতা করেছেন, এমন ৭ জন কর্মকর্তা ও ৩টি সংস্থার তথ্য জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পাপুল বাংলাদেশ তথা এশিয়ান মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বলেও ওই প্রতিবেদেন উল্লেখ করা হয়।
আরো বলা হয়, দেশি-বিদেশি পার্টনার নিয়ে কুয়েতে তিনি কোম্পানি করেছেন। যার আড়ালে তার এসব অবৈধ বাণিজ্য চলতো। বাংলাদেশে একটি ব্যাংকের পরিচালক তিনি। অর্থ সংগ্রহ ও পাচারে ওই ব্যাংককে বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছেন তিনি। কাবাস তার ফেব্রুয়ারির রিপোর্ট এখনো স্ট্যান্ড করে। তখন তারা সিআইডির বরাতে জানিয়েছিল, এমপি পাপুল ও তার দুই সহযোগী মিলে অন্তত ২০ হাজার বাংলাদেশিকে কুয়েতে চাকরির নামে পাচার করেছেন। আর এর মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। তবে ওই অর্থ তিনি কুয়েতে রাখেননি। তার আমেরিকান পার্টনারের মাধ্যমে বড় অংশ অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন।
এদিকে এমপি পাপুল ইস্যুতে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শীর্ষ পর্যায়ের দু’জন কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তারা কূটনীতিক সুবিধাপ্রাপ্ত হওয়ায় গ্রেপ্তার হবেন না। তবে যেকোনো সময় তাদের প্রত্যাহারে ঢাকাকে অনুরোধ করা হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ৬ জুন রাতে কুয়েতের মুশরেফ এলাকার বাসা থেকে সিআইডি পুলিশ তাকে আটক করে। পরদিন তাকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপন করে তার রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত ১৪ জুন পর্যন্ত তার রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ পর্যন্ত এমপি পাপুলের আইনজীবীরা ৩ দফা তার জামিন চান। কিন্তু আদালত বরাবরই তা নাকচ করেছেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: