চরম বিশৃঙ্খলায় পড়েছে মোদির ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

ভারত ও পাকিস্তান সম্প্রতি বিতর্কিত কাশ্মীর এলাকায় গুলিবিনিময় করেছে। এতে উভয় পক্ষেই কয়েক ডজন মানুষ হতাহত হয়েছে এবং সম্পদেরও প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান যদিও অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু সীমান্ত এলাকায় পরিস্থিতি এখনও উত্তপ্ত রয়েছে।

একই সাথে কালাপানি এলাকাতে সার্বভৌমত্ব নিয়ে ভারত আর নেপালের মধ্যে বিবাদ চলছিল। ১২ জুন সকালে বেশ কিছু ভারতীয় দক্ষিণ নেপালের সালাহি (সারলাহি) এলাকাতে ভাংচুর চালায় এবং নেপালের আর্মড পুলিশের সাথে সঙ্ঘর্ষে জড়ায়, যেখানে অনেকে আহতও হয়েছে। তাছাড়া সীমান্তে চীন আর ভারতের মধ্যে তীব্র অচলাবস্থাও চলছিল। অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ – যেমন মিয়ানমার, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, ভুটান ও মালদ্বীপের সাথেও ভারতের বিভিন্ন ধরণের সমস্যা রয়েছে। নরেন্দ্র মোদি সরকারের যে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি অনুসরণ করার কথা, ভারতের চারপাশের বর্তমান পরিস্থিতি তার বিপরীতে চলছে।

ঘন ঘন সীমান্ত বিবাদ এবং ভারত ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে সঙ্ঘর্ষের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ভারত এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহণের অংশ হিসেবে ট্রাম্প বারবার বলেছেন যে, তিনি ভারত-পাকিস্তান বিবাদের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করতে রাজি আছেন। চীন-ভারত সঙ্ঘাতের ব্যাপারে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এই সবকিছু মিলিয়ে ভারতে একটা জটিল পরিবেশ তৈরি করেছে – চরম জটিল পরিস্থিতি।
চলতি শতকের শুরু থেকেই ভারত ইন্দো-প্রশান্ত ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বলয়ে নিজেদের ওজন ভালোরকম বাড়িয়েছে। ইন্দো-প্রশান্ত এবং এশিয়ান বহুমেরুর ভূরাজনৈতিক বলয়ের কেন্দ্রের দিকে ক্রমেই এগিয়ে গেছে তারা। আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে তারা।

কিন্তু বিশ্ব শক্তি হয়ে ওঠার ভিত্তি হিসেবে আগে আঞ্চলিক শক্তি হয়ে উঠতে হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভালো আচরণ এবং চারপাশে একটা ভালো ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করাটা আঞ্চলিক শক্তি অর্জনের মূল ভিত্তি। মোদি সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তারা ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতিকে পররাষ্ট্র নীতির গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ ঘোষণা করেছিল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে নির্দোষ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য কঠিন চেষ্টা করেছিল। একটি প্রধান অক্ষ, দুটো প্ল্যাটফর্ম এবং তিনটি ফালক্রামকে উপায় হিসেবে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে রাজনীতি আর কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল ভারত। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা; ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের মাধ্যমে কোমল শক্তি বাড়ানো; এবং এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের কৌশলগত ক্ষেত্রকে সঙ্কুচিত করে আনা।
ভারতের নীতিকে নিম্নোক্ত উপাদানে বিভক্ত করা যায়: বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ এবং মেংবু ইন্দোনেশিয়ার মতো আঞ্চলিক উন্নয়ন ফ্রেমওয়ার্কগুলোকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে দেয়ার মাধ্যমে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলার চেষ্টা করছে। উপমহাদেশে ঘনিষ্ঠ সংযোগ ও সমন্বয় এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করতে চায়, যেটার কেন্দ্রে থাকবে ভারত। ভারতের সক্রিয় দক্ষিণ এশিয়া নীতি নিঃসন্দেহে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য ভূমিকা রাখবে এবং দক্ষিণ এশিয়া, এশিয়া এবং পুরো বিশ্ব এখান থেকে উপকৃত হবে।

কিন্তু, এই পথনির্দেশক নীতিমালাগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারতের কূটনীতির তেমন উন্নতি করতে পারেনি। বরং উল্টাটা হয়েছে। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে অস্বস্তিকর বিভিন্ন বিষয় বারবার উঠে এসেছে। মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আঞ্চলিক ভূকৌশলগত নিরাপত্তা পরিবেশ। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, বিশেষ ভৌগলিক অবস্থান, ভারতের চারপাশের স্থল ও সাগরের সম্মিলিত রূপ এবং এর থেকে সৃষ্টি জটিল ভূ-পরিবেশ ভারতকে একটা চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে।

বিভিন্ন দেশের মধ্যে দূরত্বের ভিত্তিতে ক্ষমতার পালাবদলের যে আইন – “যত কাছে, তত জোরালো, যত দূরে, তত দুর্বল” – সেটাও ভারত ও তার দুই প্রতিবেশীর উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যদি সুস্পষ্ট সীমান্ত থাকে, তাহলে সেখানে স্বাভাবিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা বিনিময় হয় এবং সঙ্ঘাতের আশঙ্কা সেখানে কম থাকে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যদি সীমানাগত বিবাদ থাকে এবং এর সাথে যদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুগুলো জড়িত থাকে, তাহলে সঙ্ঘাতের সম্ভাবনা সাধারণত বেড়ে যায়।
তাছাড়া, ভারতের সাথে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর যে সঙ্ঘাত হয়ে থাকে, সেগুলো দেখে মনে হতে পারে যে, এগুলো হঠাৎ করে ঘটেছে এবং সাময়িক। কিন্তু কার্যত, সেগুলো আসলে ভারত এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ভেতরের দীর্ঘমেয়াদি বৈপরীত্যের পুঞ্জিভূত বহিপ্রকাশ, বিশেষ করে সীমানাগত বিবাদের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিতভাবে ফেলে রাখার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়।

এটা সত্য যে, ভারতে এবং এর প্রতিবেশী দেশগুলোতে জাতীয়তাবাদ ও জনপ্রিয়তাবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠায় বিবাদের বিষয়গুলো আরও বেশি ছড়িয়ে পড়েছে যেগুলো হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা যেতো। দক্ষিণ এশিয়ায় করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি মারাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। অথচ সেখানে কিছু রাজনীতিবিদ দেশের কূটনৈতিক সমস্যাকে ব্যবহার করে জনগণের আবেগকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা করছে।

জনগণের অপরিপক্ক আদর্শিক বহিপ্রকাশের দ্বারা এবং দেশের ভেতরে সমর্থন অর্জনের জন্য, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমবেদনা অর্জনের জন্য, রাজনীতিবিদরা জনমত অর্জনের একটা মুহূর্ত তৈরি করছে, যেটার ফলশ্রুতিতে একটা সমস্যায় পড়ে গেছে ভারত।
ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের উপায়ও রয়েছে। ভারতের সীমান্তবর্তী জটিলতার উপর প্রভাব বিস্তারকারী ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, প্রতিবেশী দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবক। এই ধরণের সমস্যাগুলো যদি সমাধান করা হয় ভারতের পেশি শক্তি ব্যবহার করে, সেখানে যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর একতরফা ছাড়ের উপর নির্ভর করা হয় এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপকে এড়িয়ে যাওয়া হয়, তাহলে সেখানে উত্তেজনা আরও বেড়ে যাওয়াটা অবশ্যম্ভাবী।

সে কারণে ভারতের প্রতিবেশী নীতির উন্নয়ন এবং জটিলতার বিষয়টি বিবেচনা করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারতের বর্তমান সম্পর্কের ধারাটি সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, ভালো প্রতিবেশী ও বন্ধুত্বসুলভ নীতির প্রতি অনুগত থাকা উচিত এবং সবগুলো প্রতিবেশী দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরি করা উচিত। অবশ্যই নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য একতরফাভাবে অন্য দেশগুলোর স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া ভারতের কোনভাবেই উচিত হবে না।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বিনিময়ের জন্য সংলাপ ও সহযোগিতাকে প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত ভারতের। ভারতের উচিত প্রতিবেশী দেশগুলোর দাবিগুলো শোনা, শান্তিপূর্ণ কথাবার্তার মাধ্যমে বিনিময় করা এবং পারস্পরিক উপকার ও সকলের জন্য অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে সক্রিয়ভাবে সীমান্তবর্তী সহযোগিতায় অংশগ্রহণ করা।
(হুয়াং দেকাই ও হুয়াং কানারে দুজনেই সিচুয়ান পুলিশ কলেজের স্কলার। হুয়াং দেকাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পিএইচডিপ্রাপ্ত)।

Leave a Reply

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

%d bloggers like this: