‘কুৎসিত চেহারা’: মিয়ানমারে চীন-যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের বাকযুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্র বেইজিংয়ের নামে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে সম্মানহানির পাশাপাশি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকে চীনের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেছে মিয়ানমারের চীন দূতাবাস।
হংকং এবং দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে রোববার এক বিবৃতিতে তারা এ অভিযোগ করে।
বেইজিং তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে অবজ্ঞা করছে- যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবির প্রত্যুত্তরে মিয়ানমারে চীনের দূতাবাস বলেছে, বিদেশে ক্রিয়াশীল মার্কিন সংস্থাগুলো চীনকে আটকাতে ‘জঘন্য সব কাজকর্ম করছে’ এবং ‘স্বার্থপর, কপট, ঘৃণ্য ও কুৎসিত চেহারা’ দেখাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র গত সপ্তাহে দক্ষিণ চীন সাগর বিষয়ে তাদের বেইজিংবিরোধী অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে। বলেছে, তারা সেসব দেশকেই পৃষ্ঠপোষকতা দেবে যারা গুরুত্বপূর্ণ ওই জলসীমার ৯০% দাবি করা চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
শনিবার এক বিবৃতিতে ইয়াংগনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস দক্ষিণ চীন সাগর ও হংকং নিয়ে চীনের পদক্ষেপকে তার প্রতিবেশীদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্নের ‘বৃহত্তর প্যাটার্নের’ অংশ হিসেবে অভিহিত করেছে।
বিবৃতিতে দক্ষিণ চীন সাগর ও হংকংয়ে চীনের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মিয়ানমারে চীনের বিশাল বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এতে দেশটি বেইজিংয়ের ঋণের ফাঁদে পড়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের বিবৃতিতে মিয়ানমার থেকে চীনে নারী পাচার এবং চীন থেকে মিয়ানমারে মাদকের প্রবাহের প্রসঙ্গও এসেছে।
‘আধুনিককালে এভাবেই সার্বভৌমত্ব খোয়া যায়। নাটকীয় বা প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে নয়, বরং ছোট ছোট গাঁথুনির মধ্য দিয়ে, যা আস্তে আস্তে এর (সার্বভৌমত্ব) ক্ষয় ঘটায়,’ বলেছে তারা।
এর পাল্টায় রোববার চীন দূতাবাস বলে, চীন-মিয়ানমারের বিকাশমান সম্পর্কের প্রতি ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি যে ‘আঙ্গুর ফল টক’ ধরনের যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের বিবৃতিতেই তা দেখা যাচ্ছে।
‘নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি অন্য দিকে সরাতে এবং রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র যেসব প্রহসন করছে বিবৃতিটি তারই আরেক নজির। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত প্রথমে আয়নায় তাকানো এবং তাদের এখনও বিশ্বের বড় দেশের মতো লাগছে কিনা তা দেখা,’ বলেছে তারা।
রয়টার্স জানিয়েছে, রোববারের বিবৃতির বিষয়ে আরও জানতে ইয়াংগনের চীন দূতাবাসে ফোন করা হলেও তাদের কাছ থেকে সাড়া মেলেনি। তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসেরও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সুচির দলের ক্ষমতায় আরোহন এবং রাখাইনে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর নিপীড়ন নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনই মিয়ানমারকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে লড়াইয়ের অন্যতম ময়দানে পরিণত করেছে।
দুই পরাশক্তির সঙ্গে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক সম্পর্কের চেয়েও চীনের মূল ভূখণ্ড এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্যে সংযোগস্থল হিসেবে দেশটির কৌশলগত গুরুত্বই এক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে বলে মনে করেন লেখক ও ইতিহাসবেত্তা থান্ট মিন্ট-উ।
‘১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে মিয়ানমার সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছে, কিন্তু সামনের দিনগুলোতে পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান শত্রুতার মধ্যে এই অবস্থা ধরে রাখা যাবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়,’ রয়টার্সকে লেখা ইমেইল মন্তব্যে এমনটাই বলেছেন তিনি।
চীনের শিল্প বিপ্লবের চাপ এবং তাদের কয়েকশ কোটি ডলারের প্রজেক্ট মিয়ানমারকে পুরোপুরি বেইজিংয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলেও ধারণা মিন্ট উ-র।
‘মনে রাখা দরকার, শেষ স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও বিশ্বের যে কয়েকটি দেশে প্রক্সি যুদ্ধ হয়েছে মিয়ানমার ছিল তার একটি, এর ধারাবাহিকতাই দেশটিকে সামরিক স্বৈরতন্ত্র এবং কয়েক দশক স্ব-আরোপিত বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল,’ বলেছেন তিনি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: