কেমন চলছে পর্যটন খাত

বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯’র (নভেল করোনাভাইরাস) কারণে অন্যান্য খাতের মতো পর্যটন খাতও ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন। বলতে গেলে অন্য খাতের চেয়ে একটু বেশিই ক্ষতিগ্রস্ত এই খাতটি। ট্যুরিজমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত তিন লাখ মানুষ এবং পরোক্ষাভাবে নির্ভরশীল ৪০ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে পর্যটন খাত। অধিকন্তু সরকার ঘোষিত প্রণোদনা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
শনিবার (৪ জুলাই) বিকেলে সারাবাংলা ফোকাস’র ‘কেমন চলছে পর্যটন খাত’ পর্বে যুক্ত হয়ে, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা জাভেদ আহমেদ; প্যাসিফিক ট্রাভেল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র মহাসচিব তৈফিক রহমান; ট্রাভেলস রাইটারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল তাদের আলাপচারিতায় ট্যুরিজম খাতের এই দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন সারাবাংলা’র প্রধান প্রতিবেদক এমকে জিলানী।
এদিকে, লাইভ আলোচনায় জাভেদ আহমেদ বলেন, পর্যটন খাত সম্পর্কে সেরকম ধারণা অনেকের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। এই খাতটা ক্রমে অনেক বড় হচ্ছে। আমাদের প্রায় দেড় কোটি ‘ডমেস্টিক ট্যুরিস্ট’ রয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দেশের বাইরে যায় পর্যটনে। এক থেকে দেড় লাখ মানুষ বিদেশ থেকে আমাদের দেশে আসে।পর্যটন খাতের সঙ্গে প্রায় তিন লাখ মানুষ ডাইরেক্ট জড়িত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর ৪০ লাখ মানুষ নির্ভরশীল।
কর্মসংস্থানের সন্ধানে থাকা জেনারেশনের জন্য পর্যটন খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন ট্যুরিস্ট দশ ধরনের সেবা নেয়। মানে দশ ধরনের জব ক্রিয়েট হয়। আমাদের দেশে মানুষও অনেক বেশি। তাদের কর্মসংস্থান তৈরিতে অনন্য ভূমিকা পালন করে পর্যটন খাত — বলেন জাভেদ আহমেদ।
তিনি বলেন, ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন’র (ইউএনডব্লিউটিও) ওয়েবসাইটে লেখা আছে – ট্রাভেল ইজ ডাউন, ফেয়ার ইজ আপ, ফিউচার ইজ আনসার্টেন। আমাদের অবস্থাও কিন্তু একই রকম। কিন্তু এ রকম অবস্থায় থাকলে তো চলবে না। এর মধ্য দিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে। লকডাউন পিরিয়ডটাতে আমরা আমাদের অফিস বন্ধ রাখিনি। রিমোট থেকে কাজ করেছি। আমাদের লস এবং ডেমারেজ কী হয়েছে, সেটা নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছি। এপ্রিল পর্যন্ত আমরা হিসাব করেছিলাম পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ক্ষতির মধ্যে আছি।
পর্যটনের একটা আন্তর্জাতিকতা আছে। এটা একা একা চলে না। আমাদের আশপাশের দেশ ইন্ডিয়া, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ — এদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ আছে। ওই সমস্ত দেশ যেভাবে ট্যুরিজম রিকভারি প্ল্যান তৈরি করেছে, সেভাবে আমরাও আমাদের স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে কথা বলে রিকভারি প্ল্যান তৈরি করেছি ইউএনডব্লিউটিও’র গাইড লাইন মেনে। এটা আমাদের মধ্যে একটা আশার সঞ্চার করেছে – বলে জানান জাভেদ আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘নিউ নরমাল’ বলে একটা কথা আছে। কারণ, প্যানডেমিক তো সারা জীবন থাকবে না। প্যানডেমিক এক সময় ‘ওভার’ হয়ে যাবে। তখন আমরা আবার বিজনেস শুরু করব। বিজনেসে কী কী থাকবে, কোথায় আমরা ছাড় দেব, কোন জায়গাতে আমরা প্রণোদনা দেব— এ সমস্ত বিষয় আমরা প্ল্যানের মধ্যে পরিষ্কার করে লিখেছি।
তিনি আরও বলেন আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছি যে, সরকার ঘোষিত যে প্রণোদনা, সেটা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে ট্যুরিজম খাত। কিন্তু প্রণোদনা পেতে দেরী হচ্ছে।
অন্যদিকে প্যাসিফিক ট্রাভেল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র মহাসচিব তৈফিক রহমান বলেন, প্যানডেমিকের কারণে ট্যুরিজম একেবারে চলছেই না। বছরের শুরুতে একেবারে একেবারে পিক সিজনে বন্ধ হয়ে গেছে। সেটা আমরা ডমেস্টিক ট্যুরিজমের কথাই বলি কিংবা ইনবাউন্ড বা আউটবাউন্ড ট্যুরিজমের কথাই বলি। সবক্ষেত্রেই আমাদের কার্যক্রম একেবারে থমকে গেছে।
তিনি বলেন, তিন মাসে অফিসে গিয়েছি চার/পাঁচ দিন। আসলে ওখানে গিয়ে আমি কী করব? ওখানে গিয়ে তো আমার কোনো কাজ নেই। আমার স্টাফদের বলা হয়েছে তোমরা এখন আপাতত ঘরে বসেই কাজ করো। সুতরাং, আমরা বলতে পারি যে, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৈফিক রহমান বলেন, ট্যুরিজম কিন্তু উচ্চ বা মধ্যম শিল্প নয়, এটাকে ক্ষুদ্র শিল্পই বলা চলে। এখানে যারা বিনিয়োগ করে তাদের পক্ষে এই তিন মাস চালিয়ে নেওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। এখানে অফিস ভাড়া আছে, ইউটিলিটি চার্জ আছে, কর্মীদের বেতন আছে। তাদের হাতে এমন কোনো উদ্বৃত্তও থাকে না যা দিয়ে উদ্বৃত্ত তিন/চার মাস তারা চালিয়ে নিতে পারে। সবচেয়ে অনিশ্চয়তার জায়গা হলো, সামনে তো আমরা কোনো আলো দেখতে পারছি না। কেউ আমাদের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না যে, আগামী সেপ্টম্বর মাস থেকে সিচুয়েশন ভালো হয়ে যাবে। আগামী অক্টোবর থেকে আপনারা আপানাদের ট্যুরিজম চালাতে পারবেন।
তিনি বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় সারা পৃথিবীতে যেটা ঘটেছে তা হলো সরকার এগিয়ে আসছে এবং সরকারকে এগিয়ে আসতেই হয়। কারণ, পর্যটন এমন একটা শিল্প যে শিল্পের সঙ্গে সরকারের অনেকগুলো অর্গান জড়িত। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সেটা এখন পর্যন্ত কাগজ কলমেই আছে। আমাদের কেউ কোনো টাকা এখন পর্যন্ত পায়নি। আমাদেরকে বলা হয়েছে ব্যাংক এবং ক্লায়েন্টের রিলেশনের ওপর নির্ভর করবে এই প্রণোদনা।
দুয়েকটা ব্যাংকের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। তারা বলেছে, সরকার-অর্থমন্ত্রণালয়-বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এমন কোনো নোটিশ আমাদের কাছে আসেনি, যার পরিপ্রেক্ষিতে আপনাদেরকে আমরা লোন দিতে পারি। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চিঠি আসবে না এবং সেখানে পর্যটন খাত সম্পর্কে কোনো বিশেষ নির্দেশনা থাকবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আমদের সঙ্গে কথাই বলবে না, প্রণোদনা ঋণ তো অনেক পরের বিষয় – বলেন তৌফিক রহমান।
পাশাপাশি, ট্রাভেলস রাইটারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, পর্যটন খাতের সঙ্গে আরও অন্তত দশটা খাত সম্পৃক্ত। সুতরাং, পর্যটন খাত বাধাগ্রস্থ হলে ওই খাতগুলোও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এই বিষয়টা মাথায় রেখেই আমাদেরকে এগোতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। ইনোভেটিভ আইডিয়া নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রসঙ্গত, সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সারাবাংলা’র বিশেষ আয়োজন ‘সারাবাংলা ফোকাস’। প্রতি শনি, সোম ও বুধবার বিকেল চারটায় সারাবাংলা’র ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল ও গাজী স্যাটেলাইট টেলিভিশনে একযোগে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: