গালওয়ানে চীনকে পিছু হটানোর জন্য মূল্য দিতে হয়েছে, এলএসিতে সুবিধা হারিয়েছে ভারত

লাদাখ অঞ্চলের বিতর্কিত লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) নিয়ে ভারতের সাথে সাম্প্রতিক সামরিক বিনিময়কালে চীন সফলভাবে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে। নিজেদের কৌশলগত সুবিধার অনুকূলেই শেষ পর্যন্ত এলএসির সীমানা ঠিক রাখতে পেরেছে চীন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৩০ জুন ভারতীয় সেনাবাহিনী ও পিএলএ কমান্ডাররা সেনা প্রত্যাহারের জন্য যে প্রটোকলে শেষ পর্যন্ত সম্মত হয়েছে, সেখানে ওয়াই-নুল্লাহ সংযোগ পয়েন্টকে এলএসি নির্ধারণ করা হয়েছে, যেটা এলএসির ভারতীয় অংশের এক কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত। যে জায়গাটাতে ভারতীয়রা বহু দশক ধরে টহল দিয়ে এসেছে, সেটাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে তাদের।
ওয়াই-নুল্লাহ জংশন পয়েন্টটিতে গালওয়ান পয়েন্টটিতে একটা কড়া বাঁক নিয়েছে এবং এরপর আরও সামনে এগিয়ে শায়ক নদীতে মিশে গেছে। পিএলএ এই এলাকাটাকে গালওয়ান মোহনা হিসেবে উল্লেখ করে থাকে এবং সাম্প্রতিক সঙ্কটের শুরু থেকেই এই জায়গাকে তারা চীনের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। এমনকি ১৫ জুনের ভয়াবহ সঙ্ঘর্ষের পর চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া এক বিবৃতিতেও এই দাবি করা হয়েছে।
এলএসি সীমানা নিয়ে চীন যে দাবি জানিয়ে আসছে, সেটার ভিত্তি হলো একটা মানচিত্র যেটা ১৯৬০ সালে ভারতের সাথে বিনিময় করেছে তারা। ওই মানচিত্র অনুসারেই অধিকাংশ স্থানে নিয়ন্ত্রণ রেখা নির্ধারিত হয়েছে। মানচিত্র অনুযায়ী চীনের নিয়ন্ত্রণ রেখা গেছে এই এলাকার পূর্ব প্রান্ত দিয়ে। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, এই নিয়ন্ত্রণ রেখাকে আরও পশ্চিমে ঠেলে দেয়ার জন্য চীন ধীরে ধীরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো আকসাই চিনের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা, যেটা লাদাখের পূর্ব অংশ, যেটা তারা দখল করে রেখেছে এবং যেখান দিয়ে তাদের জি২১৯ হাইওয়ে গেছে, যেটার মাধ্যমে জিনজিয়াংয়ের সাথে তিব্বত যুক্ত হয়েছে।
এখন, সেনা সরিয়ে নেয়ার জন্য চুশুলে ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল হারিন্দার সিং এবং পিএলএ’র মেজর জেনারেল লিউ লিনের মধ্যে তৃতীয় দফার যে আলোচনা হলো, সেখানে ওয়াই-জংশন সংলগ্ন টহল পয়েন্ট (পিপি) ১৪ এলাকা, যেখানে ১৫ জুন সঙ্ঘর্ষ হয়েছে, সেটাকে এলএসি বরাবর বাফার জোন ঘোষণা করা হলো এবং সেটা আর ভারতীয় সীমানার অংশ থাকলো না।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে অজয় শুক্লা প্রথম জানান যে, উভয় সেনাবাহিনী দর কষাকষির শর্ত অনুযায়ী ওয়াই-জংশনের ১.৮ কিলোমিটারের মধ্যে একটি মাত্র অস্থায়ী তাবু বসাতে পারবে এবং ৩০ জনের বেশি সেনাকে সেখানে মোতায়েন করা যাবে না।
প্রথম পোস্টের এক কিলোমিটার পেছনে একই রকম দ্বিতীয় পোস্ট স্থাপন করা যাবে এবং সেখানে ৫০ জন সেনাকে মোতায়েন করা যাবে। দ্বিতীয় ক্যাম্পের পেছনে অবশ্য উভয় সেনাবাহিনী বাধাহীনভাবে তাদের শক্তি মোতায়েন করতে পারবে।
নতুন এই ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে দুই পক্ষের সম্মতির অর্থ হলো এই অঞ্চলের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা – যেটা বহুদিন ধরে ভারতের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেটা এখন নো ম্যান্স ল্যাণ্ডে পরিণত হলো। ভারত যদিও এখনও এই অংশের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ দাবি করে আসছে, কিন্তু নতুন শর্তে রাজি হওয়ার কারণে তাদের এই দাবিটি দুর্বল হয়ে গেলো। চীন সবসময় যে দাবি করে এসেছে যে, পুরো গালওয়ান উপত্যকাটা তাদের, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সেই দাবিটাই প্রতিষ্ঠিত হলো।
সরকারী সূত্র জানিয়েছে যে, এই দর কষাকষির মধ্য দিয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেখানে পিপি১৪ পয়েন্টের দূরত্ব মাপা হয়েছে ওয়াই জংশন পয়েন্ট থেকে, আসল এলএসি থেকে নয়। সে কারণে ভবিষ্যৎ টহলের ক্ষেত্রে পিএলএ সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেলো।
ভারতের আপত্তি সত্বেও চীনের জোরাজুরিতে এই ছাড় দিতে হয়েছে। এর অর্থ হলো ভারতীয় সেনাবাহিনী আগে গালওয়ান নদীর পিপি১৪-এ যেখানে টহল পাঠাতো, সেটা এখন ঢেলে সাজানো হলো এবং সেখান থেকে তিন কিলোমিটার দূরে থাকতে হবে এখন তাদের।
অন্যদিকে, প্রকৃত এলএসি যেহেতু ওয়াই-জংশন থেকে এক কিলোমিটার পূর্বে, তাই পিএলএকে ওই পয়েন্ট থেকে মাত্র ৪০০ মিটার সরে যেতে হবে। ফলে আঞ্চলিক দাবির ক্ষেত্রে তারা একটা বাড়তি কৌশলগত সুবিধা পাবে যেটা তাদের আগে ছিল না।
সেই সাথে, অজয় শুক্লা যেটা জানিয়েছেন এবং এই প্রতিবেদন যেটা নিশ্চিত করেছে যে, পিপি১৫ থেকে পিএলএ’র সরে যাওয়ার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি, যে পয়েন্টটা গালওয়ানের দক্ষিণে। যেখানে দুই দেশের সেনারা এখনও একে অন্যকে ব্লক করে চলেছে। তাছাড়া, বিগত কয়েক সপ্তাহে পিএলএ পিপি১৫-এর সাথে ভারতের দাবিকৃত অঞ্চলকে সংযুক্ত করে একটি সড়ক নির্মাণ করেছে। সেই সাথে হট স্প্রিংস এলাকার গোর্গা হাইটস পাহাড়ি এলাকার কাছে ২-৩ কিলোমিটার পর্যন্ত জায়গায় অনুপ্রবেশ করেছে তারা এবং সেখানেও সামরিক অচলাবস্থা চলছে।
র বাইরে প্যাংগং সো লেক অঞ্চল থেকে সেনা সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারেও কোন চুক্তি হয়নি, যেখানে পিএলএ সেনারা এলইসি লঙ্ঘন করেছে, পার্বত্য এলাকার ফিঙ্গার ৪ থেকে ফিঙ্গার ৮ এলাকায় ভারতীয় সীমানার ৮ কিলোমিটার ভিতরে অনুপ্রবেশ করেছে।
এই অঞ্চলের সাথে পরিচিত কর্মকর্তারা বলেছেন যে, নতুন যে শর্তের ব্যাপারে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে, সেটা পিএলএ-কে যে কোন সময় ও যে কোন অবস্থানে কৌশলগত সুবিধা দেবে। আবার একই সাথে সাময়িক পিছু হটে তারা নিজেদের পদক্ষেপকে যৌক্তিক হিসেবেও দেখাতে পারবে।
সামরিক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল এ পি সিং (অব.) এলএসি এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, “পিএলএ’র দিক থেকে এটা একটা স্মার্ট কৌশলগত পদক্ষেপ। এর লক্ষ্য হলো আরও বড় কৌশলগত খেলা যেটা ভবিষ্যতে সামনে আসবে”।
তিনি আরও বলেন, ভারতের দিক থেকে এটা শুধু নিয়ন্ত্রণ রেখাকে আরও ভারি অস্ত্রশস্ত্র ও সেনা দিয়ে বোঝাই করা, পাকিস্তানের সাথে ৭৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণ রেখায় যেটা করা হচ্ছে। কিন্তু এ জন্য অনেক মূল্য গুনতে হবে ভারতকে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: