বাংলাদেশে করোনাভাইরাস নিজের পরিবর্তনের কারণে নিজেই দুর্বল হয়ে গেছে- ড. মো. সেলিম খান

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা ২৮ জুলাই, ২০২০, পর্যন্ত ২৭৬টি করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) জিনোমিক রিসার্চ সেন্টারে জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন হয়েছে ২২৩টি। করোনাভাইরাসের ধরন-প্রকৃতি এবং বাংলাদেশে এর বাস্তবতা নিয়ে সাউথ এশিয়ান মনিটর’র সঙ্গে কথা বলেছেন জিনোমিক রিসার্চ সেন্টারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সেলিম খান। সাক্ষাতকার নিয়েছেন শফিক রহমান।

স্যাম: বিশ্বব্যাপী করেনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর এপ্রিলের শুরু থেকেই প্রাণঘাতি ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের একটা দাবি ছিল। বাংলাদেশে এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল। জিনোমিক রিসার্চ সেন্টার এ ক্ষেত্রে একটি বড় সাফল্য এনে দিয়েছে। এ বিষয়ে একটু ধারণা দেবেন।

সেলিম খান: জিনোম সিকোয়েন্স হলো একটা জীবের জীবন রহস্য উদঘাটন। যার মাধ্যমে ওর উৎস, গতিবিধি এবং কন্ট্রোল করার পদ্ধতি জানা যায়। আমরা যে ডাটা পেয়েছি তাতে দেখা যাচ্ছে, করোনাভাইরাসে টোটাল প্রটিনের সংখ্যা ২৮টি। এর মধ্যে একটা প্রোটিনের নাম ‘স্পাইক প্রটিন’। এটাই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রটিন। এই স্পাইক প্রোটিনে ১২৭৪টি এ্মাইনো এসিড থাকে। ওই এমাইনো এসিডের ডি৬১৪ নাম্বার পজিশনে আমাদের এখানে বারবার পরিবর্তন (মিউটেশন) ঘটেছে। আমরা যে ২৭৬টির সিকোয়েন্স করেছি তার প্রায় প্রত্যেকটায় (৯৬ শাতাংশে) এই মিউটেশনটা পেয়েছি।

স্যাম: এতগুলোর জিনোম সিকোয়েন্স করে জিনোমিক রিসার্চ সেন্টার কি পেল, আর বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ধরনটাই বা কি?

সেলিম খান: বাংলাদেশে আমরা প্রথম যে চারটা ভাইরাস পেয়েছিলাম তার একটার উৎস ছিল বেলজিয়াম। কিন্তু এর পরে আরও যে ২২৩টি পেয়েছি তার বেশির ভাগই ইউরোপিয়ান অরিজিন। বিশেষ করে ইতালির। অর্থাৎ, ইতালিতে যে ধরনের ভাইরাস অ্যাটাক করেছে আমাদের এখানেও তাই পাওয়া যাচ্ছে।

আরেকটি মজার তথ্য হলো চীনের উহানে যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছিল তা থেকে অনেক ভিন্ন বাংলাদেশের করোনাভাইরাস। এর মানে এটি যখন কোন দেশে ঢুকছে তখন পরিবর্তিত একটি রূপ নিচ্ছে।

স্যাম: ইউরোপ বা ইতালি থেকে বাংলাদেশে ঢুকলো কিভাবে?

সেলিম খান: অবশ্যই মানুষের মাধ্যমে। বাদুর-বনরুইয়ের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে। কিন্তু এখন যেটা ঘটছে সেটা মানুষ থেকে মানুষের সংক্রমণ। প্রথম দিকে ইতালি থেকে যারা বাংলাদেশে এসেছেন তাদেরকে যদি স্বাস্থ্যবিধির আওতায় নিয়ে আসা যেত তাহলে এর সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যেত।

স্যাম: বলছিলেন বাংলাদেশের ভাইরাসটির অরিজিন ইউরোপ তথা ইতালি। তাহলে ইতালিতে যেভাবে মহামারীর রূপ নিয়েছে বাংলাদেশে সেটা হয়নি কেন?

সেলিম খান: ২৭৬টির সিকোয়েন্সে যে মিউটেশনটা বেশি পেয়েছি সেটা হচ্ছে ডি৬১৪ নাম্বারের মিউটেশন। এই মিউটেশনটাই পুরো ইউরোপে বেশি পাওয়া গেছে। ইতালিতেও তাই। তবে ইতালিরটা যে হুবহু এসেছে তা নয়। এটা জিনোমিক লেভেলে চেইঞ্জ হয়েছে ৫৯০ বার এবং প্রোটিন লেভেলে ২৭৩ বার।

আরেকটা বিষয় হলো, পৃথিবীতে মোট পাঁচ ধরনের করোনাভাইরাস বিচরণ করেছে। এই পাঁচটাই বাংলাদেশে পেয়েছি। কিন্তু বেশিভাগ ক্ষেত্রেই ডি৬১৪ নাম্বার মিউটেশনটি দেখা গেছে।

স্যাম: করোনাভাইরাস সংক্রমণে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার কম হওয়ার কারণ কি?

সেলিম খান: আক্রান্তের সংখ্যা কিন্তু কম নয়, সেই তুলনায় মৃত্যু কম। অন্যান্য দেশে যে বয়সী, বিশেষ করে ৬০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে মৃত্যু হার বেশি। ওই বয়স সীমায়ও আমাদের এখানে মৃত্যু কম। ৩০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে বয়সীরা বেশি মারা গেছেন। একটা হতে পারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। তবে বাস্তব সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে আরো গবেষণা দরকার।

আরেকটা বিষয়, এখানে যে মিউটেশনটা ঘটছে সেটা বার বারই ডি৬১৪ নাম্বার মিউটেশনে। ভাইরাসে ঘন ঘন মিউটেশন ঘটলে সে দুর্বল হয়ে যায়। এটাও হয়তো একটা কারণ।

স্যাম: তাহলে কি বলা যায় বাংলাদেশের ভাইরাসটি দুর্বল?

সেলিম খান: স্পাইক প্রটিনে যে পজিশনে মিউটেশন ঘটলে বেশ শক্তিশালী হয় বাংলাদেশে ওই পজিশনে মিউটেশন এখনও পাইনি। ৩১০ থেকে ৫১৮ এর মধ্যে হলো ওই পজিশন এবং এটাকে করোনাভাইরাসের রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন পাজিশন বলে। বিশ্বের যেসব জায়গায় মহামারী আকার ধারন করেছে সেখানে এই পজিশনে মিউটেশন ঘটেছে। কিন্তু আমরা পেয়েছি শেষের দিকে ডি৬১৪-তে।

আরেকটা পজিশন হচ্ছে ৪২৪ থেকে ৪৯৪। এটাকে করোনাভাইরাসের রিসেপ্টর বাইন্ডিং মোটিভ বলা হয়। ওখানেও আমরা পাইনি। বার বার ডি৬১৪-তে পরিবর্তন ঘটেছে এবং ওর নিজের পরিবর্তনের কারণে নিজেই দুর্বল হয়ে গেছে।

স্যাম: বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুসূচকের গতি গত আড়াই মাস ধরে প্রায় সামান্তরাল রেখায় চলছে। এই পরিস্থিতিতে করনীয় কি?

সেলিম খান: বাংলাদেশে মোট সিকোয়েন্স হয়েছে ২৭৬টির। আমাদেরকে এই সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। কারণ, ডি৬১৪’র পরিবর্তনটা আমরা পেয়েছি শুধু ওই ২৭৬টির মধ্যে। অরও বেশি সিকোয়েন্সিং করা গেল হয়তো আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেত। অন্য কোন ভেরিয়েন্ট এখানে কাজ করছে কিনা সেটাও দেখার বিষয় আছে।

আমরা জিনোমিক রিসার্চ সেন্টারে যে ২২৩টির সিকোয়েন্স করেছি সেগুলোর মধ্যে দুই ধরনের সিকোয়েন্স পাওয়া গেছে। আমরা শুধু করোনাভাইরাসেরটা খুঁজে বের করিনি আরো কিছু ব্যাকটেরিয়া আছে, ভাইরাস আছে সেগুলোরও সিকোয়েন্স হয়েছে। যেগুলো করোনাভাইরাসের সঙ্গে কোরিলেশন আছে। এটা নিয়েই গবেষণা হচ্ছে। বিশেষ করে ওই ব্যাকটেরিয়া আসার পরে করোনা আক্রান্ত হচ্ছে নাকি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরে ওই ব্যাকটেরিয়া আসছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে করোনাভাইরাস ১৪ দিনের পর আর থাকেনা। কিন্তু আমাদের একেকটা রোগিকে দেড় মাস, দুই মাস, কোন কোন ক্ষেত্রে তিন মাসও হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। এখানেই দেখার বিষয় বা প্রশ্ন থাকে কোইনফেকশনের।

আরেকটা বিষয় বলা দরকার, আমাদের এখানে সংক্রমণ এবং মুত্যুর সংখ্যা বাড়ছে সব কিছু খুলে দেয়ার কারণে। এখন সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না, স্বাস্থ্যবিধিও মানা হচ্ছে না। অথচ, করোনা সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিকল্প কিছু নেই। সেটা যেহেতু করা যাচ্ছে না এখন দরকার ভেকসিন।

স্যাম: বাংলাদেশে একজন থেকে আরেকজনে করোনা সংক্রমণের হার ০.৯৯ শতাংশ। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা কম না বেশি?

সেলিম খান: এই হারটা নির্ধারণ করা হয়েছে মূলত টেস্টের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু আমরা অনেক কেস পেয়েছি যাদের মধ্যে আসলে করোনার কোন লক্ষণই ছিলনা। কিন্তু পরে টেস্টে দেখা গেছে করোনা হাইলি পজেটিভ। এখন আবার দেখা যাচ্ছে সেই টেস্টেও বিভিন্ন কারণে কমে যাচ্ছে। ফলে আমরা যদি টেস্টটা আরও ভালোভাবে করতে পারতাম তাহলে ওই রেটটা একচুয়াল হতো। তাতে হয়তো সংক্রমণের ওই হারটা আরও বেড়ে যাবে।

স্যাম: বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যে ৭৮টি ভ্যাকসিন প্রকল্প চালু আছে এবং আরও ৩৭টি নতুন প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। এর মধ্যে বাংলাদেশের জন্য কোনটা কার্যকর হবে?

সেলিম খান: যে দেশ বা যে প্রতিষ্ঠানই ভেকসিন তৈরি করুকনা কেন তারা কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল যে জিন ব্যাংক আছে তার ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করছে। ফলে যে কোন দেশের বা প্রতিষ্ঠানের ভেকসিনই আমাদের এখানে কার্যকর হবে। তবে একটা ভেকসিন তৈরি করে বসে থাকলেই চলবে না। গবেষণা প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে।

স্যাম: বাংলাদেশের তথ্য আন্তর্জাতিকভাবে জানাবার ব্যবস্থা কি?

সেলিম খান: আমরা সিকোয়েন্স করেছি অনেক। কিন্তু এই মুহূর্তে ২৭৬টির তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন-এনসিবিআই’তে এবং জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটাতে (জিএসআইডি) প্রকাশ হয়েছে। শুধু আমরা নই বিশ্বের যেখানে যখন যে যে কাজ করছেন প্রত্যেকে ওই ডেটা ব্যাংকে দিয়ে দিচ্ছেন। প্রতিদিন প্রতিক্ষণ ডেটা আপডেট হচ্ছে। সেখানে ঢুকে বিশ্বের যে কোন সাইন্টিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট ডেটা বিশ্লেষণ করে কাজ করতে পারছেন।

স্যাম: করোনভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কার অংশগ্রহণ কতটুকু?

সেলিম খান: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল এবং মিয়ানমার করেছে একটি করে, ভুটান একটিও করেনি, শ্রীলঙ্কা করেছে ৬টি, পাকিস্তান ১৪টি এবং ভারত করেছে ১৮৬১টি। তাতে বাংলাদেশ ২৭৬টি করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। আর একক ল্যাব হিসেবে প্রথম স্থানে আছে এই বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) জিনোমিক রিসার্চ সেন্টার। ইতোমধ্যে বলা হয়েছে আমরা ২২৩টির করেছি এবং একক কোন ল্যাব থেকে এত সংখ্যক জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়নি। আমাদের লক্ষ্য এক হাজারের অধিক জিনোম সিকোয়েন্সের।

স্যাম: মাল্টি ড্রাগ রেজিসটেন্ট জিনের উস্থিতির কথা বলা হচ্ছে সেটা কতটা ক্ষতিকর?

সেলিম খান: আগেই বলেছি আমরা যখন সিকোয়েন্সের কাজ করেছি তখনই কোইনফেকশনের ব্যাকেটেরিয়াগুলো পেয়েছি। ওই ব্যাকটেরিয়াগুলো এ্যানালাইসিস করতে গিয়ে বেশ কিছু মাল্টি ড্রাগ রেজিসটেন্ট জিন দেখেছি। এটা কিন্তু আমাদের দেশে নতুন না আগে থেকেই ছিল। কারণ, আমাদের রোগীরা নিজেরা এন্টিবায়োটিক খাচ্ছে আবার ডাক্তারও দিচ্ছে। এই কাজটা যখন আমরা শুরু করছি প্রথম দিকে তখন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির সাইন্টিস্টরা বললেন এটা তোমাদের এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তোমাদের হাসপাতালগুলোতে রোগী যে রোগ নিয়ে ভর্তি হয় তারচেয়ে বেশি মারা যায় ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশনে।

আমরা ইতোমধ্যে আইসোলেট করে ফেলেছি কোন জিনগুলা মাল্টিড্রাগ রেজিসটেন্স হয়ে গেছে। ২৭৬টার মধ্যেই আমরা এগুলো খুঁজে পেয়েছি এবং তালিকা করে ফেলেছি।

স্যাম: আপনাকে ধন্যবাদ।

সেলিম খান: সাউথ এশিয়ান মনিটরকেও ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

%d bloggers like this: