আপনিই মারার চেষ্টা করেছেন, ব্যর্থ হয়েছেন: খালেদাকে হাসিনা

২০০৪ সালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসমাবেশে গ্রেনেড হামলার জন্য বিএনপিকে সরাসরি দায়ী করে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তৎকালীন সংসদ নেতা বেগম খালেদা জিয়া তাকে মারার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
গ্রেনেড হামলার ঘটনার ১৬তম বার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকালে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, একটা দেশে এই রকম একটা ঘটনা ঘটে গেছে, আমি বিরোধী দলের নেতা, আমার ওপর এমন একটা গ্রেনেড হামলা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো একটি দল, যে দল দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, সেই দলের একটা সভায় এমন একটা গ্রেনেড হামলা, আর পার্লামেন্টে যিনি সংসদ নেতা, লিডার অব দ্য হাউস, প্রধানমন্ত্রী, সে দাঁড়িয়ে বলে দিল, ‘ওনাকে আবার কে মারবে।’
তিনি বলেন, এখন তো বলতে হয় যে আপনিই তো মারবেন। চেষ্টা করেছেন, ব্যর্থ হয়েছেন, সেই জন্য আর পারছেন না। সেইদিন এই রকম তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলে আমাদেরকে কোনো কথা বলতে দেয় নাই এই হামলা সম্পর্কে। অথচ আমাদের নেতাকর্মীরা, পার্লামেন্ট মেম্বাররা (তখন) আহত অবস্থায় হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন।
২০০৪ সালে সংসদে কথা বলতে না দেওয়া প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সেই অধিকারটুকু পার্লামেন্টে ছিল না যে এর ওপর আমরা আলাপ আলোচনা করতে পারি। আমাদের কাউকে মাইক দেয়নি, আলোচনা করতে দেয়নি। এর থেকে কী প্রমাণ হয়? তারা যদি সরাসরি জড়িত না থাকবে, তাহলে কি এই রকমভাবে বাধা দিতো?
বিএনপি–জামায়াত সরকারের আমলে একেকটা ঘটনা ঘটার আগে খালেদা জিয়া বক্তৃতার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেমন কোটালিপাড়ায় যে বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল, তার আগে বলেছিলেন যে আওয়ামী লীগ ১০০ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আবার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আগে বলেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা, বিরোধী দলের নেতাও হতে পারবেন না। এই ভবিষ্যদ্বাণী খালেদা জিয়া কীভাবে দিয়েছিলেন? কারণ, তাদের চক্রান্তই ছিল যে আমাকে হত্যা করে ফেলবে। তাহলে তো আমি কিছুই হতে পারবো না।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ২০০১ সালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর ওপর নানা অত্যাচার নির্যাতন শুরু হয়। সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর বোমা হামলাসহ দেশের ৫ শতাধিক স্থানে বোমা হামলা, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির প্রতিবাদে আমরা যখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সমাবেশ ও র‌্যালি করতে যাই, সেই সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। এই হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যা করাই ছিল তাদের প্রধান টার্গেট।
২১ আগস্টের দিন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা শেখ হাসিনাকে মানবঢাল তৈরি করে রক্ষা করেছিলেন। সে কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আল্লাহই বোধ হয় আমাকে হাতে তুলে বাঁচিয়েছেন, যেটা আমার নেতা-কর্মীরা মানবঢাল তৈরি করেছিল। সে সময় তৎকালীন সরকার আলামত নষ্ট করেছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার যদি এর সঙ্গে জড়িত না–ই থাকবে, তাহলে তারা আলামতগুলো কেন নষ্ট করবে। একটি অক্ষত গ্রেনেড এক সেনা কর্মকর্তা আলামত হিসেবে রাখতে চাওয়ায় খালেদা জিয়া তাকে চাকরিচ্যুত করে। তখন পুলিশ, চিকিৎসকসহ অনেকেই উদ্ধার বা সহায়তায় এগিয়ে আসেনি বলে জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের মদদ না থাকলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হতে পারে না। তাদের ধারণা ছিল আমি মারা গেছি। যখন জানল মারা যাইনি, সেই রাতে চারজনকে দেশ থেকে পালাতে সুযোগ করে দেয়। আসলে খুন করাই তাদের অভ্যাস। এরা স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না।
১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনায় খন্দকার মোশতাকের পাশাপাশি জিয়াউর রহমানও জড়িত। সেই জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়াই ক্ষমতায় এসে ২১ আগস্টের ঘটনা ঘটান এবং তার সঙ্গে তার ছেলে তারেক রহমান যে জড়িত, তা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের কথায় বেরিয়ে এসেছে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পুরো দেশটাকেই ‘সন্ত্রাসের রাজত্বে’ পরিণত করেছিল মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি না, আল্লাহ বোধহয় এ কারণেই বাঁচিয়ে রেখেছেন… বাংলাদেশের মানুষের জন্য কিছু যাতে করতে পারি, সেই জন্যই বাঁচিয়ে রেখেছেন। নইলে এই রকম অবস্থা থেকে বেঁচে আসা, এটা অত্যন্ত কষ্টকর।
প্রধানমন্ত্রী ২০০৪ সালে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং আহত যারা হয়েছেন, তাদের কথাও স্মরণ করেন। এ ছাড়া করোনাভাইরাসের এ সংক্রমণের সময়ে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান।
আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ভার্চুয়াল এই আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়াসহ দলের কেন্দ্রীয়, মহানগরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নির্মূল করার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলটির সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে বর্বর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। হামলায় দলের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান। আগত হন কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক মানুষ। হামলায় বেঁচে যাওয়া অনেকে আজও পঙ্গুত্ববরণ করে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।
ওই হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। মানববর্ম তৈরি করে তাকে রক্ষা করেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।

Leave a Reply

%d bloggers like this: