বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরে পজিটিভ থাকছেন অনেকে, ঝুঁকি কতটা?

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা ফারহানা হোসেনের স্বামী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এসময় স্বামীকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ির এক পর্যায়ে ১৮ই জুন নিজেও জ্বরে আক্রান্ত হন।
একদিন পর নমুনা পরীক্ষার জন্য দিয়ে দশ দিন পর রেজাল্ট পান যে তিনি পজিটিভ। এরপর একুশ দিনের মাথায় আবার নমুনা দিয়ে রেজাল্ট পান পজিটিভ। এর সাতদিন পর আবার নমুনা দিয়ে একই অর্থাৎ পজিটিভ রেজাল্ট পান তিনি।
এরপর সাতদিন পর আবার নমুনা দেয়ার পর নেগেটিভ রেজাল্ট আসে অর্থাৎ করোনাভাইরাস মুক্ত হন তিনি।
“১৮ই জুন জ্বর এসেছিলো আর নেগেটিভ হলাম ২৬শে জুলাই। এর মধ্যে তিন বার টেস্ট করেছি। প্রথম ১৪/১৫ দিন পর্যন্ত উপসর্গগুলো ছিল। খাবারের স্বাদ ছিলো না। শুধু লুজ মোশন ৪০ দিনের পরেও ছিলো আর সাথে ছিল দুর্বলতা”।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে তাকে বারবার কল দেয়া হয়েছিল। তবে একুশ দিন পর তারা বলেছে আইসোলেশনে থাকার দরকার নেই। সবার সঙ্গে মিশতে পারেন। তবে সাবধানে থাকবেন ও সাতদিন পর আরেকটি টেস্ট করাবেন।
“আমি যৌথ পরিবারে থাকি বলে হয়তো চাপটা কম এসেছে। তবে এটি সত্যি যার রোগটি হয়নি তার পক্ষে কষ্টটা উপলব্ধি কঠিন। প্রথম দশ দিন বিপর্যস্তই ছিলাম কিন্তু এরপর ভাবলাম বাঁচতেই হবে, সন্তানদের জন্য,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
‘৫৭ দিন ধরে কোভিড পজিটিভ’
আবার রাজশাহীর সাংবাদিক আসাদুজ্জামান নূর পজিটিভ থেকে নেগেটিভ হতে সময় লেগেছে ৫৭ দিন। মিস্টার নূর বিবিসিকে জানিয়েছেন, মৃদু জ্বরে আক্রান্ত হবার পর গত ১৮ই জুন তিনি কোভিড পজিটিভ রিপোর্ট পান। এরপর থেকে চারবার নমুনা পরীক্ষায় প্রতিবার রেজাল্ট পজিটিভ আসে। সর্বশেষ গত ১৪ই অগাস্ট দেয়া নমুনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসলে চিন্তামুক্ত হন তিনি।
“দুদিন জ্বর ছাড়া আর কোনো সমস্যা ছিল না। অথচ বারবার পজিটিভ আসছিল। নিজেকে ব্যতিক্রম মনে হচ্ছিল। যদিও চেষ্টা করেছি উৎফুল্ল থাকতে। কিন্তু পরিবারকে বোঝানো কঠিন হচ্ছিল। বাবা-মা কান্নাকাটি করতো। তাদের কান্না দেখে নিজেও বিপর্যস্ত হতাম। সবাইকে ডাক্তারের রেফারেন্স দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করতাম”।
ঢাকার ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউনুস বলছেন তার করোনাভাইরাস মুক্ত হতে সময় লেগেছে ৪২দিন।
“দীর্ঘ সময়ে এভাবে থাকার বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো পরিবার। শারীরিকভাবে তেমন সমস্যা হচ্ছিল না। কিন্তু বাচ্চারা কাছে আসতে পারে না। সবসময় আলাদা থাকতে হচ্ছে এগুলো বড় চাপ তৈরি করেছিল”।
তিনি বলেন, ৫ই জুলাই শনাক্তের পর মূলত ২৪শে জুলাইয়ের পর থেকে তার আর কোনো সমস্যা ছিল না। “কিন্তু রিপোর্ট পজিটিভ আসছিল। এটাই মানসিকভাবে পীড়া দিচ্ছিল খুব”।
কেন এত সময় লাগে নেগেটিভ হতে?
ফারাহানা হোসেন, আসাদুজ্জামান নূর ও মোহাম্মদ ইউনুস -তিনজনই বলছেন তারা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছিলেন চিকিৎসকের সাথে। চিকিৎসকরা তাদের জানিয়েছেন যে মূলত মৃত ভাইরাসের উপস্থিতি থাকায় এ ধরনের রিপোর্ট আসছিল।
ফারহানা হোসেন বলছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসকরাই বলেছেন এখানে পরীক্ষায় শরীরের জীবাণুটা থাকলেই তা ধরা পড়ে কিন্তু সেটি জীবিত নাকি মৃত সেটি নির্ধারণ করা যায় না। ফলে উপসর্গ না থাকলে তা নিয়ে চিন্তা না করতে বলো হয়েছিল তাকে।
আসাদুজ্জামান নুর বলছেন, তাকে চিকিৎসকরা বলেছেন যে ৮৪দিন পর্যন্ত একই ব্যক্তির বারবার নমুনা রিপোর্ট পজিটিভ আসার নজির আছে।
“আমি এগুলো দিয়েই নিজেকে বুঝিয়েছি। ভাবতাম হয়তো আমি ব্যতিক্রম। তবে মনোবল হারাতে দেইনি,” বলছিলেন তিনি। একই কথা বলছেন মোহাম্মদ ইউনুস।
“এভাবে এতদিন থাকার কারণে ঘুম কমে যাচ্ছিলো। ফলে আলাদা করে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছিলো। তবে ডাক্তাররা বলেছেন বারবার যে মৃত ভাইরাসের উপস্থিতির কারণে এমনটি হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে ঠিক হয়ে যাবে”।
দীর্ঘসময় আক্রান্তদের ঝুঁকি কতটা?
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা: মুশতাক হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে মূলত দশ দিনের পরে আর ভাইরাসটি জীবিত থাকে না।
“কিন্তু ডেড ভাইরাসের অস্তিত্ব থাকলে রিপোর্ট বারবার পজিটিভ আসতে পারে। তবে লক্ষণ না থাকলে চিকিৎসার আর দরকার হয় না। মনে রাখতে হবে। ঔষধ সেবন ছাড়া পরপর তিন জ্বর না আসলে তাকে করোনামুক্ত বলে ধরা হয়”।
তিনি বলেন, লক্ষণ থাকলে অবশ্যই আইসোলেটেড থাকতে হবে এবং সাধারণত সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে উপসর্গ চলে যায়। সে কারণেই বাংলাদেশে ১৪ দিনের কথা বলা হয়েছে।
“এরপরেও ডেড ভাইরাস থাকে অনেকের। কেন এটি থেকে যায় সেগুলো নিয়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু উপসর্গ না থাকলে কার্যত আর চিকিৎসার দরকার হয় না। তাই এটি আলাদা করে ঝুঁকি তৈরি করে তা বলা যায় না।তবে নেগেটিভ না আসা পর্যন্ত সতর্ক থাকাই হবে উত্তম”।
মিস্টার হোসেন বলছেন, আক্রান্ত যিনি যতদিনই হোন না কেন তাকে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চলা উচিত এবং ফলোআপ করানো দরকার যাতে করে অন্য কোনো সমস্যা তৈরি না হয়। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

Leave a Reply

%d bloggers like this: