লাদাখে ভারতের দুঃস্বপ্ন সহসা কাটছে না

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

ভারত প্রবাদবাক্যের ‘জলে কুমির, ডাঙ্গায় বাঘ’ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। দেশটি একদিকে অর্থনৈতিক মন্দায় পড়েছে, অন্যদিকে করোনাভাইরাস আঘাত হানছে, ঠিক এই সময়টিতেই শক্তিশালী প্রতিবেশী চীনের সাথে সীমান্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে।
এমনকি উত্তেজনা প্রশমিত হলেও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নয়া দিল্লীর সবচেয়ে খারাপ সামরিক দুঃস্বপ্ন এখনো শেষ হয়নি। তারা বলছেন, ভারত অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে গেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সে চীনের সাথে ব্যয়বহুল সীমান্ত বিবাদ থেকে মুক্ত হতে পারেনি।
প্রশমন সমঝোতার পর পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে বলা হলে সুইডেনের উপাসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অশোক স্বন স্পষ্টভাবে বলেন, এই সঙ্কটের কোনো সমাধান নেই। ভারত অপেক্ষা করছে চীনের সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য। কিন্তু তা কখনোই ঘটবে না।
তিনি উল্লেখ করেন, মাঠের অবস্থা এখনো চীনের অনুকূলে। ড. স্বন বলেন, বেইজিংয়ের নেতারা জানেন যে তারা ভালো অবস্থায় আছেন এবং তারা সম্ভবত শীতকালের জন্য অপেক্ষা করবেন। এই অনিশ্চয়তা কৌশলগতভাবে চীনের জন্য সহায়ক হচ্ছে।
চীনের সাথে চুক্তির ব্যাপারটি ভারতীয় মিডিয়া একেবারে গুরুত্বহীন করে দেখেছে। সীমান্ত অচলাবস্থা কাটছে না, দীর্ঘ শীতের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। চীন এর জন্য প্রস্তুত।
ড. স্বন বলেন, হিমালয় সীমান্ত এলাকায় প্রাণঘাতী মারামারি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোয়েন্দা ব্যর্থতাই তুলে ধরেছে। এটি একটি মারাত্মক সঙ্কট, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশাসন অক্ষম।
তিনি বলেন, কূটনৈতিক ফ্রন্টে ভারত ইতোমধ্যেই নিসঙ্গ হয়ে পড়েছে। অথচ এখানে সে প্রাধান্য বিস্তারের জন্য আশাবাদী ছিল। নয়া দিল্লীর সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক থাকা প্রায় সব দেশই এখন বেইজিংয়ের বলয়ে চলে গেছে। নয়া দিল্লীর কূটনৈতিক বিকল্পগুলো প্রতিনিয়ত সঙ্কুচিত হচ্ছে।
বিরোধপূর্ণ সীমান্তে দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে হাতাহাতি লড়াই হিসেবে যেটিকে অভিহিত করা হয়েছে, সেটি এখন ২০১৭ সালের পর সবচেয়ে বিপজ্জনক সঙ্ঘাতে পরিণত হয়ে গেছে। চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সঙ্ঘাত তাদের আন্তঃজাতীয় সম্পর্কের টাইমলাইনকে ফুটো করে দিয়েছে।
স্বন বলেন, মোদি সরকারের ভ্রান্তি বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করেছে। কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল, চীনের সাথে ভূখণ্ড বিরোধ নিয়ে উস্কানিমূলক বিবৃতি, দক্ষিণ চীন সাগরে ভারতের ভূমিকা চীনকে অসন্তুষ্ট করেছে। তিনি হিমালয় অঞ্চলে সঙ্ঘাত বৃদ্ধির দায় পুরোপুরি মোদির ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।
চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের উল্লেখ করে ড. স্বন বলেন, এই সঙ্ঘাত সামাল দেয়ার মতো সক্ষমতা ভারতের নেই। অর্থনীতির অবস্থা খারাপ। চীনের সামরিক শক্তির সাথে তুলনা করা যায় না ভারতকে।
ড. স্বন বলেন, মোদির নেতৃত্ব নিয়ে সমলোচনা করার বদলে ভারতের সরকারপন্থী মিডিয়া দৃশ্যত মোদির ব্যর্থতাগুলো ঢেকে রাখার কাজেই ব্যস্ত। ভারতীয় মিডিয়া চীন সম্পর্কে যাচাইহীন প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এটি আগুনে ইন্ধন যোগাচ্ছে।
তিনি বলেন, চীনের সাথে সীমান্ত বিরোধ মোদির হিন্দু-জাতীয়তাবাদী অ্যাজেন্ডার জন্য সহায়ক হবে না। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সাথে সঙ্ঘাত হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের জন্য সহায়ক হয়েছিল। কিন্তু চীনের সাথে বর্তমান সীমান্ত বিরোধে বিজেপি সুবিধা পাবে না।
দিল্লীভিত্তিক সাংবাদিক রাহুল বেদির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপারেশন পারাকারামে যেভাবে করেছিল, সেভাবে লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী সরে আসতে পারবে না। তিনি দি ওয়্যারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, ভারতকে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে, ২৫ থেকে ৩০ হাজার সৈন্য মোতায়েন করতে হবে। চীনের সাথে সঙ্ঘাতে ভারতের বিপুল ব্যয় হবে। আর তাতে করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের কাজ পিছিয়ে যাবে।
বাস্তব অবস্থা
কয়েক দশক ধরেই চীন-ভারত সম্পর্কে সীমান্ত বিরোধ সবচেয়ে বড় উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বিষয়। বর্তমান উত্তেজনা সম্পর্কে প্রখ্যাত প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ইনামুল হক বলেন, ভারত সত্যিকারের একটি ভীমরুলের চাকে ঢিল ছুঁড়েছে।

জেনারেল হক বলেন, আমি মনে করি না যে দরকষাকষি বা দাবি আদায়ের মতো কোনো অবস্থানে আছে ভারত। এই সঙ্কটে চূড়ান্ত মুখ রক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে যোগাযোগ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ভারত কম অংশ পাবে। কারণ, তাদের আলোচনার অবস্থান দুর্বল, আর চীন ভালো মনোভাবে নেই।
সাবেক এই জেনারেল বলেন, কোনো পক্ষই যুদ্ধ চায় না। তিনি ভারতের জেনারেল বিপিন রাওয়াতের সমালোচনা করে বলেন, ভারতীয় সামরিক বাহিনী লাদাখ সঙ্কটকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে সম্ভবত আনায়াসসাধ্য বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। এর কী পরিণাম হতে পারে, সে ব্যাপারে তাদের তেমন কোনো ধারণা ছিল না।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে দেখা
সর্বশেষ অবস্থা থেকে মন্তব্য করতে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, দুই পক্ষ এখনো বিপদ থেকে মুক্ত হয়নি। মস্কোতে সই হওয়া চুক্তি সঙ্কট অবসানের ইঙ্গিত দেয়নি। পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত। নতুন চুক্তির ব্যাপারে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া ঠিক নয় আমাদের।
উইড্রো উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র এসোসিয়েট ও এশিয়া প্রোগ্রামের উপ-পরিচালক কুগেলম্যান বলেন, দুই দেশের শীর্ষ দুই কূটনীতিক একটি চুক্তিতে সই করেছেন। সম্ভবত এটি রণাঙ্গনের পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কহীন।
এই সঙ্কটে ভারতের বিকল্প সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে কুগেলম্যান বলেন, নয়া দিল্লীর বিকল্প সীমিত, বিশেষ করে সামরিক দিক থেকে।
তিনি বলেন, ভারতের সবচেয়ে বড় বাজি হলো তার ভূমি দখলে রাখা। উভয়পক্ষই মুখরক্ষামূলক ব্যবস্থার জন্য মুখিয়ে আছে।
তিনি বলেন, তবে এর মানে এই নয় যে এই সঙ্কট ভেল্কিবাজির মতো শেষ হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, চীন যদি খারাপ আবহাওয়ায় সৈন্য রাখতে চায়, তবে ভারতের সামনেও সৈন্য রাখা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।
ওয়াশিংটনভিত্তিক এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বেইজিং বা নয়া দিল্লীর কেউ তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ চায় না। তবে তিনি মনে করেন, চীনা সৈন্যদের অবস্থান ও চলাচলের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা সমর্থন দেবে নয়া দিল্লীকে।

Leave a Reply

Stay Home. Stay Safe. Save Lives.
#COVID19

%d bloggers like this: