সিনহাকে মাদক ব্যবসায়ী বানানোর পরামর্শ ছিলো এসপির!

কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার ঘটনায় গঠিত প্রশাসনিক কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এই প্রতিবেদন জমা দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির তদন্তে জানা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত মেজর রাশেদ মোহাম্মদ সিনহাকে হত্যার পর তার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেন ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার পরিকল্পনা করেন। এসপির পরামর্শেই টেকনাফের বরখাস্ত হওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত হোসেন বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের হাতে ৮০ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে ৫৮৬ পৃষ্ঠার সংযুক্তিও জমা দেয়। এছাড়া ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্ম না হয় সেজন্য প্রতিবেদনে ১৩টি সুপারিশ করেছে এ কমিটি-জানিয়েছে সূত্র।
কমিটি সূত্র জানায়, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার সাহার নির্দেশেই মেজর সিনহাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর এসপি এবিএম মাসুদ হোসেন ওসির পক্ষ নিয়ে সিনহাকে ইয়াবা ব্যবসায়ী বানানোর পন্থা শিখিয়ে দেন। তদন্ত কমিটির সুপারিশে বলা হয়, পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযোগ এলে পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এতে পুলিশের একপেশে তদন্ত নিয়ে মাঝেমধ্যে প্রশ্ন উঠে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তদন্ত নিয়ে অবিশ্বাস ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। এজন্য পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রভাবমুক্ত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা গঠন করা যেতে পারে।
এই কমিটি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে। এছাড়া পুলিশের অস্ত্র-গুলির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার আগে কমিটি কক্সবাজারের টেকনাফ, মেজর সিনহার ভিডিও ধারণের স্থল শাপলাপুর পাহাড়, কথিত বন্দকযুদ্ধের ঘটনাস্থল, কক্সবাজার হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে ৬৮ জনের স্বাক্ষ্যগ্রহণ করে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশমনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রতিনিধি সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম সাজ্জাদ হোসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন।
এবিষয়ে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের তদন্তে যা কিছু উঠে এসেছে তা মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে জমা দিয়েছি। আমাদের হাতে এখন আর কিছু নাই। তাই এ বিষয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, তদন্ত রিপোর্ট হাতে পেয়েছি। এখন বিশ্লেষণ চলছে। ঘটনাটি কেন ঘটেছে, কীভাবে ঘটেছে এসব বিষয়ে আমাদের স্টাডি করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীও তদন্ত করছে। সবকিছু সমন্বয় করা হবে।
সিনহা হত্যার পর পরই চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা শাপলাপুরের মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাধারণ মানুষ, পুলিশ চেকপোস্টের পাশে থাকা এপিবিএন চেকপোস্টের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদসহ সরেজমিনে তদন্ত করে কারণ ও উৎস খোঁজেন।
এদিকে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, হত্যার বিষয়টি আদালতের নির্দেশে তদন্তাধীন, তাৎক্ষনিকভাবে আমরা একটা তদন্ত করেছিলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি এই রিপোর্ট পর্যালোচনা করবে, যদি আদালত চায় আমরা দেবো।
তিনি বলেন, পত্রিকায় কীভাবে প্রকাশ হলো সেটা আমার জানা নেই। যে প্রকাশ করেছে ও তথ্য সরবরাহ করেছে তারা কাজটি সঠিক করেনি। এ বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। আর ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে আমরা তা দেখবো।
এদিন সিনহা হত্যা মামলায় অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্য কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন- কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আব্দুল্লাহ আল-মামুন ও এএসআই লিটন মিয়া।
এ মামলায় অভিযুক্ত ১৩ জনের মধ্যে এর আগে প্রধান আসামি ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীসহ ৮ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
এর আগে পুলিশের অপর তিন সদস্য ওসি প্রদীপ, পরিদর্শক লিয়াকত ও এএসআই নন্দদুলালকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের মধ্যে প্রদীপকে চার দফায় ১৫ দিন এবং লিয়াকত ও নন্দ দুলাল রক্ষিতকে তিন দফায় ১৪ দিন করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। লিয়াকত ও নন্দদুলাল ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও প্রদীপ রাজি হননি। তারা সবাই এখন কারাগারে রয়েছেন। এপিবিএনের তিন সদস্যসহ এ পর্যন্ত ১২ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, গত ৩১ জুলাই রাত ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। এ ঘটনা প্রকাশের পর দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলে ঘটনার উৎস, কারণ ও ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন না ঘটে সেই বিষয়ে সুপারিশ দিতে ২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি চার সদস্যের কমিটি গঠন করে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর প্রতিনিধি অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক জাকির হোসেন খান ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শাজাহান আলী।
সাত কর্মদিবস অর্থাৎ ১০ আগস্টের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময় বেঁধে দেয় মন্ত্রণালয়। এরপর প্রথমবার কমিটির সময় বাড়ানো হয় ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। পরে কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সময় ফের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
এ সময়ের মধ্যে ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত টেকনাফ থানার বহিষ্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বক্তব্য গ্রহণ করতে না পারায় কমিটির মেয়াদ সর্বশেষ ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ২ সেপ্টেম্বর কমিটি কক্সবাজার জেলা কারাগার ফটকে প্রদীপ কুমার দাশের বক্তব্য গ্রহণ করে।
পূর্বপশ্চিমবিডি

Leave a Reply

%d bloggers like this: