ছদ্মবেশে মধ্যরাতে থানায় থানায় সিএমপি কমিশনার!

তিনি কখনো সিএনজি অটো রিকশায়; কখনো নিজ প্রাইভেট কারে চেপে ঘুরে বেড়ান চট্টগ্রাম মহানগরীর রাজপথ। এসময় থাকেনা কোনও পুলিশ প্রটেকশন কিংবা অধীনস্থ কর্মকর্তাদের দৌড়ঝাঁপ! তিনি একাই রাত ৯ টা কিংবা ১০ টার পর বের হন নগরীর বিভিন্ন থানা পরিদর্শনে। তাকে না চেনার জন্য ধরেন ছদ্মবেশ! বুঝার চেষ্টা করেন আসলেই একজন সাধারণ মানুষ কেমন সেবা পাচ্ছেন পুলিশ থেকে!
সিএমপিতে যোগ দিয়েই অক্টোবর মাস থেকে এরকমই ছদ্মবেশে থানা পরিদর্শন করছেন পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। কখনো থানায় গিয়ে সরাসরি ওসির বা ডিউটি অফিসারের কক্ষে নিজের পরিচয়imageপ্রকাশ করেন আবার কখনো ছদ্মবেশেই থানা পরিদর্শন করে থাকেন। এরকম ছদ্মবেশে কয়েকটি থানা পরিদর্শনে গিয়ে একজন এসআই ও একজন কনস্টেবলকে অসদাচরণের জন্য বরখাস্তও করেছেন সিএমপি কমিশনার। আর দায়িত্বে অবহেলার জন্য কয়েকজন সহকারী পুলিশ কমিশার (এসি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তিরস্কারও করেছেন।
এ প্রসঙ্গে শনিবার দুপুরে জানতে চাওয়া হয় সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীরের কাছে। প্রসঙ্গ শুনেই তিনি হেসে উঠেন! এসময় সিভয়েসকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করবো না। দেখি কতটুকু করা যায়, কি হয়!’
ছদ্মবেশে থানা পরিদর্শন, কয়েকজনকে বরখাস্তের বিষয়গুলো তুলে ধরলে তিনি আবারও হেসে উঠেন। বলেন, ‘আমি মন্তব্য করব না।’ তবে সিএমপির একাধিক কর্মকর্তা পুলিশ কমিশনারের ছদ্মবেশে থানা ও চেকপোস্ট পরিদর্শনের বিষয়টি সিভয়েসকে নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশ কমিশনার যখন ছদ্মবেশে নগরীর রাজপথ ও পুলিশি কর্মকাণ্ড পরিদর্শনে বের হন তখন হয় প্রাইভেট কারে চড়েন না হয় সিএনজি অটো রিকশায় চড়েন। এই বিষয়টা তার বডিগার্ডকেও জানতে দেন না। অনেক সময় বডিগার্ড থাকলেও তাকে থানার বাইরে রাখেন আর তার মোবাইল জব্দ করেন আগেই।
অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে নগরীর চান্দগাঁও থানায় এসে ছদ্মবেশে সেবাপ্রার্থী সেজে থানার নীচ তলার পুরো কার্যক্রম দেখেন সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। এরপর ওসির রুমে প্রবেশ করে থানার রেজিস্টার যাচাই করেন। সেখান থেকেই ফোন করেন ওই জোনের ডিসিকে। জানতে চান হাজতে থাকা আসামির পরিসংখ্যানসহ রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ অনেক তথ্য! এরপর সেখান থেকে দ্রুত চলে যান ছদ্মবেশী পুলিশ কমিশনার।
পুলিশ কমিশনার সেখান থেকে বহদ্দারহাট-মুরাদপুর হয়ে আতুরার ডিপো হয়ে অক্সিজেন মোড় পৌঁছান। এই অক্সিজেন মোড় উত্তর চট্টগ্রাম থেকে নগরীতে প্রবেশের অন্যতম প্রবেশমুখ। সেখানে রাত্রিকালীন চেকপোস্টের কার্যক্রম দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেন ছদ্মবেশী কারে থাকা পুলিশ কমিশনার। পরে চেকপোস্টে হাজির হয়ে নিজের পরিচয় সামনে আনেন এবং ওই জোনের (সহকারী পুলিশ কমিশনার) এসিকে স্পটেই হাজির করিয়ে দায়িত্বে অবহেলার জন্য সর্তক করেন দায়িত্বরতদের।
এর কিছুদিন পর এ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ছদ্মবেশী পুলিশ কমিশনার সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে ছুটে যান ডবলমুরিং থানায়। সেখানে গিয়ে রাত ১০ টার দিকে ফ্রন্ট ডেস্ক অফিসারের কাছে একটি জিডি করার ‘অনুরোধ’ করেন। তখন কর্তব্যরত অফিসার জিডি করতে ‘বকশিস’ চান ছদ্মবেশী পুলিশ কমিশনারের কাছে। এরপর দ্রুত সেখান থেকে চলে যান পাহাড়তলী থানায়। সেখানে নিজের মত করে পরিদর্শন করে থানার গেটে দায়িত্বরত পুলিশ কনস্টেবলের কাছে বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজি অটোরিকশা ডেকে দেওয়ার ‘অনুরোধ’ করেন ছদ্মবেশে থাকা নগর পুলিশের শীর্ষ এ কর্মকর্তা। কিন্তু প্রতি উত্তরটি সুখকর ছিলনা পুলিশ কমিশনারের জন্য। এই চারটি থানা পরিদর্শনের পর বুঝেছেন কেমন চলছে তার সিএমপির সেবা কার্যক্রম।
পরে কয়েকজন এসি ও ওসিকে তিরস্কার করেন সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। আর জিডি করতে ‘বকশিস’ চাওয়া ওই এসআই ও অসহযোগিতা করা পুলিশ কনস্টেবলকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত ৭ সেপ্টেম্বর সিএমপির ৩০ তম পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন ৩২ মাস আগে অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া নগর পুলিশের নতুন অভিভাবক সালেহ মোহাম্মদ তানভীর।
দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবাদিকদের সামনে এসে জানিয়েছিলেন নানা পরিকল্পনার কথা। শুনিয়েছিলেন সিএমপিতে পরিবর্তনের কথা। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সিএমপির প্রত্যেক সদস্য হবে জনবান্ধব আর থানা হবে পুলিশি সেবার মূল কেন্দ্রস্থল। অপরাধ করে কেউ যেমন পার পাবেনা তেমনি পুলিশ সদস্যরাও জবাবদিহিতার বাইরে থাকতে পারবে না। পুলিশের পোস্টিং বাণিজ্য নিয়ে অনৈতিক লেনদের কথা অনেকটা ওপেন সিক্রেট। সেই বদনামি ঘোচাতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর।
‘যেই কথা, সেই কাজ’ গতমাসে খুলশী ও আকবর শাহ থানার ওসি পদে দুজনকে পদায়নে লেনদেন হয়নি কোন অর্থ। এমনকি শুনা হয়নি কারো তদবিরও। সম্পূর্ণ পেশাদার চৌকস দুই পরিদর্শককে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পদায়ন করেন পুলিশ কমিশনার। সন্দেহজনক পুলিশ সদস্যদের করানো হচ্ছে ডোপ টেস্ট। থানাকে সেবার মূল কেন্দ্র বানাতেই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন পুলিশ কমিশনার। সেজন্য প্রত্যেক থানাকে সিসিটিভির আওতায় আনার কথাও বলেছিলেন তিনি। এরইমধ্যে নিজেই ছদ্মবেশে রাতে পরিদর্শন করছেন সিএমপির থানাগুলো।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে পুলিশে ঘুষ-দুর্নীতি আর হয়রানি বন্ধে ছদ্মবেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) টিম থানায় থানায় যাওয়ার কথা চাউর হয়েছিল। তবে সেটা তেমন কার্যকর না হলেও ওই সময়ে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া সালেহ মোহাম্মদ তানভীর এই কার্যক্রম এখন শুরু করেছেন। তার এ ছদ্মবেশী থানা পরিদর্শনে ইতোমধ্যে সিএমপির ১৬ থানা ও ৩১টা ফাঁড়ির কর্তব্যরতদের মনে আতঙ্ক তৈরী করেছে বলে জানা গেছে।
বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা রাত হলেই নিজ নিজ থানা ও ফাঁড়ি এলাকায় তৎপরতা বাড়িয়ে দেন। ফোর্স ও ডিউটি অফিসারদের বাড়তি সর্তক করেন। সেবা প্রার্থীদের সেবা প্রাপ্তিতে যাতে বিড়ম্বনার শিকার হতে না হয় সেটা নিশ্চিতে তৎপর হয়ে উঠেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ভাই এখন কমিশনার স্যার রাতে ছদ্মবেশে বের হন। কোন সময় এসে কি অনিয়ম উনার চোখে পড়ে সেই টেনশনে থাকি।’ এরকম আতঙ্কের কথা সিভয়েসকে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা।

Leave a Reply

%d bloggers like this: