ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ‘মারাত্মত পতনের দিকে’: প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের অধীনে মিডিয়া, নাগরিক সমাজ এবং বিরোধীদের মত প্রকাশের ক্ষেত্র মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত হয়ে আসার কারণে ভারত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে তাদের মর্যাদা হারাচ্ছে। সুইডেন-ভিত্তিক ভি-ডেম ইন্সটিটিউট ২০২০ সালের ‘ডেমোক্র্যাসি রিপোর্টে’ এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।
ইউনিভার্সিটি অব গুটেনবার্গ-ভিত্তিক স্বাধীন এই গবেষণা ইন্সটিটিউটটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। ২০১৭ সাল থেকে তারা প্রতি বছর বহুল তথ্যনির্ভর গণতন্ত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। এই রিপোর্টে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্রের স্ট্যাটাসকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই ইন্সটিটিউটটি বলেছে, গণতন্ত্রের উপর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।
২০২০ সালের রিপোর্টের শিরোনাম হলো ‘অটোক্র্যাটাইজেশান সার্জেস – রেজিস্ট্যান্স গ্রোজ’। এই রিপোর্টের শুরুতেই যে সব তথ্য দেয়া হয়েছে, তাতে দেখানো হয়েছে যে বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক চর্চার মাত্রা হ্রাস পাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ২০০১ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো বিশ্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ ৯২টি দেশে স্বৈরশাসনের উত্থান ঘটেছে, যে দেশগুলোর জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫৪%।
এতে বলা হয়েছে যে, প্রধান জি২০ দেশগুলো এবং বিশ্বের সবগুলো অঞ্চল এখন ‘স্বৈরশাসনের তৃতীয় ঢেউয়ের’ আওতায় পড়েছে, যেটা ভারত, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মতো বড় অর্থনীতি ও বড় জনসংখ্যার দেশগুলোর উপরও প্রভাব ফেলেছে। রিপোর্টের মুখবন্ধে বলা হয়েছে, “ভারতে গণতন্ত্রের মানের খাড়া পতন অব্যাহত রয়েছে এবং এমন পর্যায়ে তারা গেছে যে, তাদের গণতান্ত্রিক মর্যাদা প্রায় চলে গেছে”।
এই মুহূর্তে ৩১টি দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হামলার শিকার হচ্ছে। দুই বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল ১৯। তাছাড়া, স্বৈরশাসনের দেশগুলোতে একাডেমিক স্বাধীনতাও গত ১০ বছরে ১৩% হ্রাস পেয়েছে। একই সাথে এই দেশগুলোতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও বিক্ষোভ করার স্বাধীনতাও ১৪% হ্রাস পেয়েছে।
রিপোর্টে এই ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিষয়টি বিশ্বজুড়ে ঘটছে, এবং সব অঞ্চলেই এর প্রভাব পড়েছে। এতে বলা হয়েছে, “সাব সাহারা আফ্রিকা হলো বিশ্বের একমাত্র অঞ্চল যেখানে এখনও গণতন্ত্রের চর্চার অধীনে রয়েছে স্বৈরশাসন যেখানে প্রভাব ফেলেনি”।
রিপোর্টে দেখা গেছে জনসংখ্যার দিক ভারত সবচেয়ে বড় দেশ যারা স্বৈরশাসনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, হাঙ্গেরি, পোল্যাণ্ড এবং ব্রাজিলের মতো ভারতের ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ‘স্বৈরশাসনের প্রথম ধাপ হিসেবে এই দেশগুলোতে গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের বাক স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করা হচ্ছে”।
রিপোর্টে আরও ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, “ভারতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে দমন চলছে, সেটার সাথে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বর্তমান হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার জড়িত”।
ভারতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দমনের বিষয়টি প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দমন ও হয়রানি চালানো হচ্ছে। বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা এ ব্যপারে মোদি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যাতে সাংবাদিকদের প্রতি সদাচরণ করা হয়।
ভারতীয় গণতন্ত্রের আরও স্তম্ভ – যেমন পার্লামেন্টারি প্রক্রিয়া, পার্লামেন্টে প্রশ্নোত্তরের সময় কমিয়ে আনা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে গেছে।
প্রতিবেদনে যে সব ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তার মধ্যে একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ভারতে বোরকা পড়া একজন নারী একটি প্ল্যাকার্ড হাতে ধরে রেখেছেন, যেখানে লেখা – “আমরা গণতন্ত্র চাই, স্বৈরতন্ত্র নয়”।
প্রতিবেদনের সূচকে ভারতকে ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ হলো ভারতে অপেক্ষাকৃত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে সুশাসন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরণের দুর্বলতা রয়ে গেছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: