“অপরের সমালোচনার চেয়ে আত্নপর্যালোচনায় সফল ও আলোকিত জীবনের সোপান”

আত্মসমালোচনা-অতিথি কলামঃ-

আত্মসমালোচনা অর্থ নিজের সমালোচনা করা,নিজের দূর্বলতা কোথায় খোঁজে বের করা এবং ঐ দূর্বলতা দূর করে নিজেকে দক্ষ, যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা এবং দুনিয়া-আখেরাতে সফল হওয়ার পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া।
আরবিতে মুহাসাবা আর ইংরেজীতে , self-criticism বা self-accountability অর্থাৎ
আত্মসমালোচনা বা আত্মসমীক্ষা।

আত্মসমালোচনা প্রতিটি মানুষের জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষ নিজের হিসাব নিজে নিতে পারে, দৈনিক কাজকর্মের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করতে পারে, আত্ম পর্যালোচনা করতে পারে এবং ওই ভুল ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিদিন নিজেকে পরিশুদ্ধ করে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিতে পারে সেই বেশি দুনিয়াতে সফলও আলোকিত হয়। আখেরাতেও সফল।

আত্মসমালোচনাকে প্রতিটি মোমিনের জন্য অপরিহার্য ঘোষণা করে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত আগামীকালের জন্য (অর্থাৎ আখিরাতের জন্য) সে কী প্রেরণ করেছে, তা চিন্তা করা। আর তোমরা তাদের মত হয়ও না, যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে, ফলে আল্লাহ তাদের আত্মভোলা করে দিয়েছেন (অর্থাৎ তারা কোন কাজটি ভালো, কোনটি মন্দ তা বাছাই করা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে)। নিশ্চয়ই তারা ফাসিক।’ (সূরা: হাশর- ১৮)।

আত্মসমালোচনাকারীদের প্রশংসা করে পবিত্র কোরআনের অপর একটি অংশে আল্লাহ বলেছেন, ‘যাদের মনে আল্লাহর ভয় রয়েছে, তাদের ওপর শয়তানের আগমন ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনা শক্তি জাগ্রত হয়ে উঠে।’ (সূরা আল আ’রাফ–৭/২০১)।

আত্মসমালোচনার গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর নির্দেশনা হতে হজরত ওমর (রা.) বলেছিলেন, ‘তোমরা নিজেদের আমলনামার হিসাব নিজেরাই গ্রহণ কর, চূড়ান্ত হিসাব দিবসে তোমাদের কাছ থেকে হিসাব গৃহীত হওয়ার পূর্বেই। আর তোমরা তোমাদের আমলনামা মেপে নাও চূড়ান্ত দিনে মাপ করার পূর্বেই। কেননা আজকের দিনে নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করতে পারলে আগামীদিনের চূড়ান্ত মুহূর্তে তা তোমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। তাই সেই মহাপ্রদর্শনীর দিনের জন্য তোমরা নিজেদের সুসজ্জিত করে নাও, যেদিন তোমরা (তোমাদের আমলসহ) উপস্থিত হবে এবং তোমাদের কিছুই সেদিন গোপন থাকবে না।’ (তিরমিজি: ২৪৫৯, সনদ মওকুফ ছহীহ)।

অধিকহারে মন্দকাজ বান্দার অন্তরকে কঠিন করে তোলে ও ধীরে ধীরে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন বান্দা কোনো পাপ করে তখন তার অন্তরে কালো দাগ পড়ে যায়।

যখন সে তওবা করে তখন সেটা তুলে নেওয়া হয়। আর তওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে অন্তরকে পরিষ্কার করা হয়।

আর যদি পাপ বাড়তেই থাকে তাহলে দাগও বাড়তে থাকে। আর এটাই হলো মরিচা। ’ –তিরমিজি

জীবনে সুখী,সফল ও উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে হলে আত্নসমালোচনার কোন বিকল্প নেই।
কিন্তু দূর্ভাগ্য এই জাতীর নেতা,নেত্রী, ধর্মীয় নেতা,শিক্ষকসহ সাধারণ জনগণ সবাই আমরা পরের সমালোচনায় অভ্যাস্ত, অপরের সামান্য দোষত্রুটি দেখলেই সমালোচনায় লিপ্ত হয়,তাকে অসম্মান করার জন্য নিজেদের সব শক্তি নিয়োগ করি আর নিজেদের দোষের কথা বেমালুম ভুলে যায়।নিজেদের দোষের সামান্যতম সমালোচনা, পরামর্শ সহ্য করতে আমরা প্রস্তুত নই,বরং শত্রু মনে করে পরামর্শদাতার ক্ষতি করতে উঠেপড়ে লেগে যায়।

শিক্ষিত ও হুজুরদের মধ্যে পারস্পরিক সমালোচনা পরিমাণ কমিয়ে, নিজেদের দোষ- ত্রুটি চিহ্নিত করে নিজেদের ও দলের পরিশুদ্ধতার দিকে নজর দেওয়ার অভ্যাস করতে পারলে, সাধারণ জনগণ ও আত্নসমালোচনায় উদ্বুদ্ধ হবে, পরের সমালোচনা বা গীবতের বড় পাপ হতে মুক্তি পাবে।
আমি বা আমার দল হক, বাকিরা সব খারাপ এই ধারণা হতে গীবতের সূচনা হয়।
নিজেদের আত্মসমালোচনা করে এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়, এই আমিই সেরা,আমাদের আমল, চরিত্র সেরা বাকিরা ফাও, আকিদাই খারাপ এই ধারণাই মুসলমানরা আজ শতধা বিভক্ত।

এই আত্মতুষ্টি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে মাথায় ডুকিয়ে দেওয়া হয়,
ফলে আমাদের পক্ষে নিজেদের ত্রুটি ও সমস্যাগুলো ধরার যেমন সুযোগ থাকে না, তেমন
থাকে না তা সংশোধনের জন্যও কোনরূপ ব্যবস্থা।

তাই এখন সময় এসেছে ব্যক্তি,পরিবার ও দলগত আত্মসমালোচা করার, নিজের ভুল চিহ্নিত করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার।

আল্লামা ইবনুল কাইয়েমের মন্তব্য এখানে আরো
স্পষ্ট। তিনি বলেন, আত্মসমালোচনার অর্থ হচ্ছে-
নিজের জন্য কী করণীয় এবং কী বর্জনীয় তা
পৃথক করে ফেলা। অতঃপর সর্বদা ফরয ও নফল
কতর্ব্যসমূহ আদায়ের জন্য প্রস্ত্তত থাকা এবং হারাম
বা নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ পরিত্যাগ করার উপর সুদৃঢ় থাকা।

আত্মসমালোচনা আমাদের বিবেককে শানিত করে,জাগিয়ে তোলে। নিজের সমালোচনা করতে পারলে আমাদের চিন্তা শক্তি,বিচারবুদ্ধি প্রখর হয়, নিজেকে সফল, দক্ষ, যোগ্য ও প্রজ্ঞাবান করে তুলে জীবনকে আলোকিত পথে এগিয়ে নেওয়া সহজ হয়।
দলীয়,গোষ্ঠীগত সমালোচনা টোটাল জাতীকে শান্তি, কল্যাণ ও উন্নত দিকে পরিচালিত করে।

একজন লেখকের আত্মসমালোচনার বিষয়ে নিম্নোক্ত আহ্বান আমার খুব ভাল লেগেছে। তাই তুলে ধরলাম —-

“আত্মসমালোচনা আমাদের আরো শিক্ষা দেয়,অন্যের ত্রুটি ধরার পূর্বে নিজের ত্রুটি দেখো। অন্যের নিন্দা করার পূর্বে নিজের মধ্যে যা কিছু খারাপ তা দূর করে নাও। এই নীতি যদি আমরা অবলম্বন করতে পারি তবে আমরা নিজ থেকেই নিজেদেরকে সংশোধন করে নেওয়ার চেষ্টা চালাতে পারব, তেমনি অন্যের মাঝে ভুল দেখতে পেলে, নিজের ভুলের মত মনে করে তা ভালবাসা ও স্নেহের সাথে সংশোধনের চেষ্টা নিতে পারব। এভাবে সমাজ পরিণত হবে পারস্পরিক সহযোগিতা, ভালাবাসা ও সৌহার্দ্যে পূর্ণ এক স্বর্গীয় সমাজ। অতএব আসুন! আমরা নিজেদেরকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসাবে, প্রকৃত মুসলমান হিসাবে গড়ে তোলার জন্য জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ সতর্কতার সাথে ফেলি। নিজেকে সচ্চরিত্রবান, নীতিবান ও আদর্শবান করে তুলি।”

“হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ দান কর এবং জাহান্নামের আগুন(আযাব) হতে আমাদের রক্ষা কর”
সূরা বাকারা –২০১

১৪/১১/২০২০

Leave a Reply

%d bloggers like this: